সারাবিশ্ব

সিরিয়ায় কেন হামলা চালালো জর্ডান?


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম

সিরিয়ায় কেন হামলা চালালো জর্ডান?
ছবি: সংগৃহীত

সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে বিমান হামলা চালিয়েছে জর্ডান। গত সপ্তাহে জর্ডানের একটি গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আস্তানা লক্ষ্য করে এ অভিযান চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে আম্মান। তবে জর্ডানের এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে দামেস্ক। সিরিয়ার দাবি, জর্ডানের বিমান হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে। ফলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশটির বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান দক্ষিণ-পূর্ব সিরিয়ার কয়েকটি সন্ত্রাসী স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। অভিযানে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন। এ ছাড়া তাদের ব্যবহৃত কয়েকটি যানবাহনও ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে জর্ডানের সামরিক বাহিনী। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট স্থান, অভিযানে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং হতাহতের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি আম্মান।

জর্ডানের সামরিক বাহিনীর আরেকটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দামেস্কের সঙ্গে সমন্বয় করেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। তবে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির অভিযোগ, আগাম কোনো সমন্বয় বা আনুষ্ঠানিক নোটিশ ছাড়াই সিরিয়ার ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছে জর্ডান। দুই দেশের বক্তব্যের এই পার্থক্য হামলার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

গির্জায় হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য করে অভিযান

জর্ডানের দাবি অনুযায়ী, গত ২৩ অক্টোবর দেশটির একটি গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় হামলার ঘটনায় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস), যা আইএসআইএল নামেও পরিচিত, দায় স্বীকার করেছে। ওই হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া বা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে-এমন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান শনাক্ত করে সিরিয়ায় অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে জর্ডান।

গির্জায় হামলার ঘটনাটি জর্ডানের সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় কারাক গভর্নরেটে একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলাকালে ওই হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে নয়জন নিহত হন। ঘটনার পর জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এ ঘটনার পর জর্ডানের নিরাপত্তা বাহিনী হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে। সোমবার দেশটির জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, ওই সহিংসতার ঘটনায় গোলাগুলির পর দুই ভাই ও তাঁদের ভগ্নিপতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জর্ডানের জননিরাপত্তা বিভাগের প্রধান মেজর জেনারেল ওবাইদুল্লাহ আল-মায়েতাহ গ্রেপ্তার তিন সন্দেহভাজনের নাম প্রকাশ করেন। তাঁরা হলেন হাজ্জা জাইদান মোহাম্মদ, মিশাল জাইদান মোহাম্মদ ও আহমাদ সামি হুসেইন।

ঘটনার পর জর্ডানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিন আল-ফারায়েহ তরুণদের মধ্যে উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, কী ধরনের পরিস্থিতি তরুণদের উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, তদন্ত তখনো শেষ হয়নি। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত গ্রেপ্তার সন্দেহভাজনদের সঙ্গে অন্য কোনো গোষ্ঠী বা সেলের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জর্ডানের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান সিরিয়ার, উঠেছে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জর্ডানের বিমান হামলার বিষয়ে তাদের ‘পূর্ণ আপত্তি’ জানিয়েছে। দামেস্কের অভিযোগ, দুই দেশের মধ্যে আগাম কোনো সমন্বয় ছাড়াই সিরিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালানো হয়েছে। জর্ডান অভিযানটিকে সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরলেও সিরিয়ার পক্ষ থেকে একে দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এ হামলাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছেন। সিরিয়ার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক মানুষের বসতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সিরিয়া থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক হেইডি পেট জানিয়েছেন, সিরীয় কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, জর্ডানের বিমান হামলায় দেরা ও সুয়েইদা অঞ্চলের গ্রামাঞ্চলে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে। হামলার পর উদ্ধারকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালান।

সিরিয়ার জরুরি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার পর চারটি স্থানে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা হয়েছে। দেশটির সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো থেকে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ উদ্ধার করেন।

দেরা ও সুয়েইদায় হামলা, নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু

সিরিয়ার সিভিল ডিফেন্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেরা প্রদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় লাজাত এলাকার আল-তাফ গ্রামে একটি তাঁবুতে বিমান হামলায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তিনটি শিশু ও একজন নারী রয়েছেন। এ ঘটনায় পরিবারের আরও তিন সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে উদ্ধারকারী সংস্থাটি।

এ ছাড়া দেরা অঞ্চলের নাসিবের কাছে আল-শায়াহ খামার এলাকায় হামলায় ৮০ বছর বয়সী রিয়াদ কাররাদ নিহত হন। তাঁর মরদেহ দেরা ন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পশ্চিম দেরা অঞ্চলের আইন আল-বাসাল এলাকায় মুজাইরিব শহরের একটি বাড়িতেও হামলা চালানো হয়। তবে ওই ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অন্যদিকে, সুয়েইদা প্রদেশের উত্তরাঞ্চলীয় শুহাইব শহরে একটি বাড়িতে হামলায় ৬০ বছর বয়সী মুৎলাক আবু আল-খাইল নিহত হন। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারে কাজ করছিলেন উদ্ধারকর্মীরা।

জর্ডান বলছে, তাদের অভিযানের লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান ও স্থাপনা, বেসামরিক মানুষ নয়। তবে সিরিয়ার পক্ষ থেকে বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সে বিষয়ে আম্মানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে হামলার লক্ষ্যবস্তু ও হতাহতের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে।

হামলার পর নাসিব সীমান্ত চৌকি বন্ধ

জর্ডানের বিমান হামলার পরপরই দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থল যোগাযোগপথ নাসিব সীমান্ত চৌকি বন্ধ করে দিয়েছে সিরিয়ার শুল্ক কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে যাত্রী ও বাণিজ্যিক যানবাহন চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত এই সীমান্ত চৌকি বন্ধ হওয়ায় যোগাযোগ ও বাণিজ্যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সীমান্ত চৌকিটি দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এমন পরিস্থিতিতে হামলাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে সীমান্ত চৌকি বন্ধ রাখার বিষয়ে সিরিয়ার পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

২০২৩ সাল থেকে সিরিয়ায় অভিযান চালাচ্ছে জর্ডান

সিরিয়ার ভূখণ্ডে জর্ডানের বিমান হামলা এবারই প্রথম নয়। ২০২৩ সাল থেকে মাদক ও অস্ত্র পাচারকারীদের লক্ষ্য করে দেশটি একাধিকবার সিরিয়ায় অভিযান চালিয়েছে। জর্ডানের দাবি, সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচারের সঙ্গে জড়িত। এসব গোষ্ঠীকে দমনে সীমান্তের ওপারে অভিযান চালানো প্রয়োজন বলে মনে করে আম্মান।

জর্ডানের সন্দেহ, পাচারকারী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইরান-সমর্থিত কিছু সংগঠনের যোগসূত্র রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত, তা প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সিরিয়ায় জর্ডানের বিমান হামলায় নারী ও শিশু নিহত হওয়ার ঘটনার পর মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিল। সংস্থাটি বলেছিল, দক্ষিণ সিরিয়া থেকে মাদক পাচারের হুমকি যত গুরুতরই হোক না কেন, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটানো সীমান্তপারের বিমান হামলার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

আগের এসব অভিযান নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সাম্প্রতিক হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জর্ডানের নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি অন্য দেশের ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান পরিচালনার বৈধতা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং হামলার পরিণতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সিরিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?

জর্ডানের হামলার পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে হামলার প্রকৃত পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে জর্ডানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে। দামেস্ক জানিয়েছে, সিরিয়ার নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, জর্ডান তাদের অভিযানকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। দেশটির বক্তব্য অনুযায়ী, গির্জায় হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকানোই অভিযানের উদ্দেশ্য। তবে সিরিয়ার ভূখণ্ডে হামলার আগে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সব মিলিয়ে, জর্ডানের গির্জায় হামলার তদন্ত, আইএসের দায় স্বীকার, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সিরিয়ায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার অভিযোগ-সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। সিরিয়া কী ধরনের কূটনৈতিক বা নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নেয় এবং বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের অভিযোগের বিষয়ে জর্ডান কী ব্যাখ্যা দেয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।