সারাদেশ

চার সন্তানকে মানুষ করে শেষ বয়সে একা, ভাড়া বাসা থেকে মায়ের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০১ পিএম

চার সন্তানকে মানুষ করে শেষ বয়সে একা, ভাড়া বাসা থেকে মায়ের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার
ছবি: সংগৃহীত

বরিশালের বাবুগঞ্জে একটি ভাড়া বাসা থেকে তাহমিনা বেগম (৬৫) নামে এক নারীর পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। স্বামীর মৃত্যুর পর চার সন্তানকে লালন-পালন ও প্রতিষ্ঠিত করতে জীবনের দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেছেন তিনি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে প্রায় ১০ বছর সৌদি আরবে কাজও করেছেন। তবে জীবনের শেষ সময়ে নতুন হাট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় একাই থাকতেন এই নারী। গত রোববার দুপুরে ওই বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এক থেকে দুই দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাহমিনা বেগম বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের রাকুদিয়া গ্রামের মৃত কদম আলী হাওলাদারের স্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুর পর চার সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রায় এক দশক সৌদি আরবে কাজ করেন। সেখান থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তাঁদের লালন-পালন ও প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। তাঁর বড় ছেলে সুমনের ঢাকার উত্তরায় একটি ছয়তলা ভবন ও বৈদ্যুতিক বোর্ড তৈরির কারখানা রয়েছে। ছোট ছেলে আওলাদও ঢাকায় কাজ করেন। অন্যদিকে, তাঁর দুই মেয়ে হিরা ও মুক্তার বিয়ে হয়েছে।

জানা গেছে, প্রায় তিন মাস ধরে বাবুগঞ্জের নতুন হাট এলাকার একটি ভাড়া বাসায় একাই বসবাস করছিলেন তাহমিনা। বাসার মালিক আব্দুর বারেক জানান, প্রায় তিন মাস আগে তাহমিনার বড় ভাই বাসাটি ভাড়া নিয়ে তাঁকে সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। ওই নারী বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগতেন। মাঝেমধ্যে তাঁকে আশপাশের বাজার ও দোকানগুলোতে ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত। তবে গত দুই দিন তাঁকে বাইরে দেখা যায়নি।

বাসার মালিকের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকেল থেকে বাসার আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। প্রথমে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেননি তিনি। পরে রোববার সকালে দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে ওই কক্ষের ভেতর থেকে গন্ধ আসার বিষয়টি বুঝতে পারেন। এরপর তাহমিনার বড় ভাইকে খবর দেওয়া হয়। তিনি বাসায় এসে কক্ষের ভেতরে বোনের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, গত তিন মাসে তাহমিনাকে দেখতে তাঁর সন্তানদের কেউ ওই বাসায় আসেননি। তবে এ বিষয়ে সন্তানদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, প্রতিবেশীদের ভাষ্য, তাহমিনা আগে কয়েকবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ ছাড়া হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর পা প্রায়ই ফুলে থাকত এবং তিনি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও করতেন না।

স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, শনিবার রাতে তাহমিনার ছেলে তাঁর মায়ের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। তবে ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। এদিকে, তাহমিনার ছেলে-মেয়েরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। ফলে মায়ের সঙ্গে তাঁদের সাম্প্রতিক যোগাযোগ এবং তাঁর একা বসবাসের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি।

মরদেহ উদ্ধারের সময় পরিবারের সদস্যরা পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাজে বাধা দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তাহমিনার মৃত্যুর আগে তাঁর শারীরিক অবস্থা কেমন ছিল এবং কী পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়েও স্থানীয়ভাবে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

বাবুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।