অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে স্বর্ণের দাম


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম

আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে স্বর্ণের দাম
ছবি: সংগৃহীত

শক্তিশালী মার্কিন ডলার, উচ্চ সুদের প্রত্যাশা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) মুদ্রানীতিবিষয়ক বৈঠককে সামনে রেখে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে। সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হলেও ভবিষ্যতে তা বাড়ানোর কোনো ইঙ্গিত আসে কি না, সেদিকেই এখন নজর রাখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকদের ধারণা, ফেডের কঠোর মুদ্রানীতির অবস্থান অব্যাহত থাকলে স্বর্ণের দামে আরও নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা ৪২ মিনিটে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ০.৪ শতাংশ কমে ৪ হাজার ০.৫২ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডিসেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য স্বর্ণের ফিউচার মূল্যও ০.৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৪.৪০ ডলারে দাঁড়ায়। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের বিনিময়মূল্য এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা মূল্যবান এই ধাতুর বাজারে প্রভাব ফেলছে।

এদিকে, বিশ্বের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে মার্কিন ডলারের সূচক ০.৩ শতাংশ বেড়ে প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। সাধারণত ডলারের মূল্য বাড়লে অন্যান্য মুদ্রায় লেনদেনকারী বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারে নির্ধারিত স্বর্ণের দাম তুলনামূলক বেশি হয়ে যায়। এতে স্বর্ণের চাহিদা কমার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এর দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ পড়ে।

অ্যাকটিভট্রেডসের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী রিকার্ডো ইভানজেলিস্তার মতে, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফেড সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে রাখতে পারে-এমন প্রত্যাশা জোরালো হচ্ছে। পাশাপাশি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের উচ্চ মুনাফার হার এবং ডলারের শক্তিশালী অবস্থানও স্বর্ণের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ, স্বর্ণ থেকে নিয়মিত সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায় না। ফলে সুদবাহী সম্পদ থেকে বেশি মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণের আকর্ষণ কিছুটা কমতে পারে।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা নতুন করে জোরালো হয়েছে সৌদি আরবে হুথিদের হামলার পর। এদিন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১১৬ ডলারের কাছাকাছি ছিল। তেলের মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

ফেডের নীতিনির্ধারকেরা চলতি সপ্তাহে সুদের হার বাড়ানোর পরিবর্তে তা অপরিবর্তিত রাখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হলে ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। সিএমই গ্রুপের ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বাজারের অংশগ্রহণকারীরা ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়তে পারে-এমন সম্ভাবনা ৮২ শতাংশ ধরে লেনদেন করছেন। এই প্রত্যাশা স্বর্ণের বাজারে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানে রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিও চলতি সপ্তাহে বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে। ফেডের বৈঠকের পর জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি নিয়ে বৈঠকে বসবে। অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব বৈঠকের সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বক্তব্য আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজার ও মূল্যবান ধাতুর দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদ ধরে রাখার সুযোগব্যয় বেড়ে যায়। অর্থাৎ, স্বর্ণে বিনিয়োগ করার পরিবর্তে সুদবাহী সম্পদে অর্থ রাখলে তুলনামূলক বেশি আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ কারণে উচ্চ সুদের হার বা সুদের হার বাড়ার প্রত্যাশা সাধারণত স্বর্ণের দামের জন্য নেতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়। বিপরীতে, সুদের হার কমার সম্ভাবনা তৈরি হলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা বৃহস্পতিবার প্রকাশিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ভোগব্যয় (পিসিই) মূল্যসূচকের তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। দেশটিতে মূল্যস্ফীতি পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি, যা ফেডের মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশেষ গুরুত্ব পায়। ফেডের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ২ শতাংশ। পিসিই সূচকে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দেখা গেলে সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে রাখার পক্ষে যুক্তি আরও জোরালো হতে পারে।

রিকার্ডো ইভানজেলিস্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফেডের কঠোর মুদ্রানীতির ইঙ্গিত কিংবা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পিসিই মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দাম ৩ হাজার ৯০০ ডলারের দিকেও যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তবে স্বর্ণের প্রকৃত মূল্যগতিপথ নির্ভর করবে ফেডের সিদ্ধান্ত, মূল্যস্ফীতির তথ্য, ডলারের অবস্থান এবং বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়ার ওপর।

এদিকে, স্বর্ণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও কমেছে। মঙ্গলবার স্পট মার্কেটে রুপার দাম ১.৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৫৩.২৩ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে প্লাটিনামের দাম ১.৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৫০১.৩০ ডলারে দাঁড়ায়। প্যালাডিয়ামের দামও ২.৯ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ১৯.৫০ ডলারে নেমে আসে।

সব মিলিয়ে শক্তিশালী মার্কিন ডলার, উচ্চ সুদের প্রত্যাশা এবং মূল্যস্ফীতির অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে চাপ তৈরি করেছে। এখন ফেডের মুদ্রানীতির সিদ্ধান্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের পিসিই মূল্যসূচকের তথ্যের ওপর নির্ভর করছে স্বর্ণের পরবর্তী গতিপথ। এসব তথ্য প্রত্যাশার বিপরীত হলে বাজারের বর্তমান প্রবণতায় পরিবর্তনও আসতে পারে।