জাতীয়
জাপানে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
জাপানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলো ফলপ্রসূ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, জাপানের বেসরকারি খাত থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত হোসেন স্বাধীন উপস্থিত ছিলেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, জাপানে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের দ্বিতীয় কার্যদিবস মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মসূচি ছিল বেশ ব্যস্ত। এদিন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান, যৌথ প্রেস ব্রিফিং এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়াসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি সম্পন্ন হয়।
বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অর্জন তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের আগ্রহকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা রয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগের বাস্তবায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে।
বাংলাদেশ ও জাপানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট-ইপিএ) দ্রুত বাস্তবায়ন ও কার্যকর করার বিষয়েও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাঁর মতে, এ চুক্তি কার্যকর হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। হুমায়ুন কবির বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি ও বৈশ্বিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব এবং বিগত সরকারের ১৫ বছরের দুর্নীতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য আরও তিন বছর সময় চেয়েছে। এ বিষয়ে জাপান সরকার বাংলাদেশের অবস্থান ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে বলে তিনি জানান।
অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে জাপানি অর্থায়নে জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর সিটি বা টেক সিটি গড়ে তোলা এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যবস্থাপনার মতো প্রকল্পগুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে যৌথ মিনিস্ট্রিয়াল কমিটি গঠন এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা চালুর ওপর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাপানের বিশেষ দূতের ভূমিকা এবং এ বিষয়ে জাপানের সহযোগিতার আশ্বাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের অংশ হিসেবে জাপানের জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থাপনা খাতের অভিজ্ঞতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শীর্ষ বৈঠক ও যৌথ প্রেস ব্রিফিং শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। পরে তিনি দেশটির একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ লজিস্টিকস কেন্দ্র চিবা লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, জাপানের এসব স্থাপনা ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে দেশে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, জ্বালানি অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং কার্যকর লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও টিকে থাকার বিষয়েও সংবাদ সম্মেলনে আলোচনা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, জাপানে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং জাপানি ভাষা শিক্ষার কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের সুযোগ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে কোনো চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, বৈঠকে মূলত নীতিগত ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। আলোচনায় উঠে আসা উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।