সারাবিশ্ব

রাশিয়ার ওপর প্রভাব খাটিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ভারতের সহায়তা চায় পোল্যান্ড


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম

রাশিয়ার ওপর প্রভাব খাটিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ভারতের সহায়তা চায় পোল্যান্ড
ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে রাশিয়ার ওপর ভারতের কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছে পোল্যান্ড। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি এই আহ্বান জানিয়েছেন। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে মস্কোর সঙ্গে নয়াদিল্লির যে যোগাযোগ রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে যুদ্ধবিরতি ও অর্থবহ শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে আশা করছে ইউরোপের একাংশ। তবে প্রশ্ন উঠেছে, রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকলেও ভারত কি সত্যিই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারবে?

সম্প্রতি ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূয়সী প্রশংসা করেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার এই সময়ে তিনি মোদিকে ‘আশার আলো’ হিসেবে বর্ণনা করেন। দুই নেতার আলোচনায় ইউক্রেন যুদ্ধ ও এর সম্ভাব্য সমাধানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশ পোল্যান্ড ইউক্রেনকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ফলে যুদ্ধের অবসান এবং ইউরোপে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি ওয়ারশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নেওয়া সব প্রচেষ্টাকে ভারত সমর্থন করবে। নয়াদিল্লির এই অবস্থান থেকে যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রতি দেশটির সমর্থনের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। তবে ভারত ঠিক কী ধরনের উদ্যোগ নেবে, কিংবা রাশিয়া ও ইউক্রেনকে আলোচনার টেবিলে আনতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সফরকালে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ এবং শস্য ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভারত একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এসব প্রস্তাবের বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি এবং কূটনৈতিক অগ্রগতির বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।

নয়াদিল্লি সফরের আগেই ডোনাল্ড টাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে ভারত গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে পারে। তাঁর কাছে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি মস্কোর সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে নয়াদিল্লি। ইউরোপের অনেকের ধারণা, এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ভারতকে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন এবং শান্তি আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

তবে ভারতের কূটনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে আশাবাদ থাকলেও বাস্তবতা সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেই যে দেশটি ক্রেমলিনের সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে নয়াদিল্লির যোগাযোগ থাকলেও যুদ্ধ পরিচালনা, সামরিক কৌশল কিংবা সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মস্কো ভারতের পরামর্শ মেনে নেবে-এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

পোল্যান্ডে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ওয়াধওয়ার মতে, ইউরোপের চাপের মুখে ভারত তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেবে, এমন সম্ভাবনা কম। শুরু থেকেই নয়াদিল্লি রাশিয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম না হয়ে ভারত সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সংঘাত নিরসনের আহ্বান জানিয়ে এসেছে।

ভারত রাশিয়া ও ইউক্রেন-উভয় পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে পারলেও সেই যোগাযোগের ফলে যুদ্ধরত পক্ষগুলো সমঝোতায় রাজি হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। যুদ্ধ বন্ধের জন্য উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের সমাধান এবং পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার মানসিকতা প্রয়োজন। ফলে শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর নির্ভর করে দ্রুত কোনো সমাধানে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।

জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া বক্তব্যে অনিল ওয়াধওয়া বলেন, পোল্যান্ড চায় ভারত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুদ্ধবিরতি এবং অর্থবহ আলোচনার জন্য মস্কোকে উৎসাহিত করুক। তবে রাশিয়ার সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর ভারতের প্রভাব যে সীমিত হতে পারে, পোল্যান্ডও তা স্বীকার করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাবেক এই ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের মতে, ভারতের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি না করে কূটনৈতিক যোগাযোগকে বাস্তবসম্মত ফলাফলে রূপ দেওয়া। ভারত সংঘাত কমাতে, দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখতে এবং আলোচনার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু যুদ্ধের অবসান নিশ্চিত করার ক্ষমতা এককভাবে ভারতের হাতে নেই।

সব মিলিয়ে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ভারতের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে পোল্যান্ডের আগ্রহ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নয়াদিল্লির গুরুত্বকে সামনে এনেছে। তবে রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে ভারত কতটা অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে, তা নির্ভর করবে মস্কো ও কিয়েভের অবস্থান, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার সদিচ্ছার ওপর। ভারতের উদ্যোগ যুদ্ধ বন্ধের পথ সুগম করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তির জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতি ও কার্যকর পদক্ষেপ অপরিহার্য।