অর্থনীতি

৫৫ বছরে সবজির দাম স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

৫৫ বছরে সবজির দাম স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

দেশে গত ৫৫ বছরেও সারা বছর সবজিসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ও দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারা বছর পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে দেশীয় বাজারে ডালের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে আয়োজিত এক সভার শুরুতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাজারে কোনো পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা এবং সেই পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকা দুটি ভিন্ন বিষয়। বাজারে পণ্য সহজলভ্য কি না, তা সরবরাহের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা এবং দীর্ঘ সময় সহনীয় পর্যায়ে বজায় থাকাকে মূল্যের স্থিতিশীলতা বলা যায়। তাই বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সরবরাহ ও দাম-দুটি বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

পেঁয়াজের উদাহরণ তুলে ধরে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশে পেঁয়াজের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কয়েক লাখ টন বেশি হলেও মৌসুমের বাইরে এর দাম বেড়ে যায়। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায় শাকসবজির বাজারেও। নির্দিষ্ট মৌসুমে উৎপাদন বেশি থাকায় দাম কমে আসে, আবার মৌসুম শেষ হলে সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে দাম বেড়ে যায়। সারা বছর পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কোল্ড স্টোরেজের ব্যবহার বাড়ানো এবং যেসব সময়ে কোনো পণ্যের উৎপাদন কম থাকে, সেসব সময়ে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে মৌসুমি পণ্যের সরবরাহ সারা বছর বজায় রাখা সম্ভব হবে। এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে মৌসুম পরিবর্তনের কারণে বাজারে পণ্যের দামের বড় ধরনের ওঠানামাও কমিয়ে আনা যাবে।

তিনি আরও বলেন, গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশে সারা বছর বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে মৌসুমের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে পণ্যের প্রাপ্যতা ও দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব।

শীতকালীন সবজির দামের উদাহরণ দিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, মাত্র ২০ দিন আগেও কোনো কোনো সবজির দাম কেজিপ্রতি ১২০ টাকা ছিল। তবে শীতের সবজি বাজারে আসতে শুরু করায় সেসব পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। আবার মৌসুমের শেষ দিকে উৎপাদন ও সরবরাহ কমে গেলে দাম বেড়ে যায়। ফলে সারা বছর সবজির দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হলে উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।

এদিকে, আগামী রমজানে আমদানি পণ্যের বুকিং মূল্য ও জাহাজভাড়া বেড়ে গেলে ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে কি না-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমদানি পণ্যের বুকিংয়ের সিদ্ধান্ত মূলত বেসরকারি ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়িক কৌশলের ওপর নির্ভর করে। সরকার ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট দামে পণ্য বুকিং দিতে বাধ্য করতে পারে না।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, কোনো ব্যবসায়ী আগাম নির্দিষ্ট দামে পণ্য বুকিং দেওয়ার পর রমজানের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে সেই পণ্যের দাম কমে গেলে তাঁকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। একইভাবে আমদানি করা পণ্যের পরিবহন ব্যয়ও অনেক ক্ষেত্রে আগাম পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। জাহাজে পণ্য বোঝাইয়ের সময় পরিবহনভাড়া নির্ধারিত হওয়ায় আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থেকে যায়। এসব বিষয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারদরের ওপরও পড়তে পারে।

বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে না থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময়মূল্যের পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ধরনের চাপ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ডিমের দামের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে ডিমের দাম ডজনপ্রতি ৫০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পরে সেই দাম আবার কমে ৪০ টাকার ঘরে নেমে এসেছে। তাঁর মতে, বাজারের পরিস্থিতি বুঝতে হলে শুধু কোনো পণ্যের দাম বিবেচনা করলেই হবে না; একই সঙ্গে পণ্যটির সরবরাহ, বাজারে প্রাপ্যতা এবং দামের পরিবর্তনের কারণও বিশ্লেষণ করতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, আমদানি ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে সারা বছর পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হলে মৌসুমভিত্তিক দামের বড় ধরনের ওঠানামা কমবে এবং সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বাজার পরিস্থিতি আরও সহনীয় করা সম্ভব হবে।