শিক্ষা

জিপিএ-৫ পেয়েছে বন্ধু, বিশ্বাস হয়নি আরেক বন্ধুর, গোপনে পুনঃনিরীক্ষণের পর রেজাল্ট আসল ‘ফেল’


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

জিপিএ-৫ পেয়েছে বন্ধু, বিশ্বাস হয়নি আরেক বন্ধুর, গোপনে পুনঃনিরীক্ষণের পর রেজাল্ট আসল ‘ফেল’
ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় এক শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ পাওয়া নিয়ে সন্দেহ ছিল তার এক বন্ধুর। ওই শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাওয়ার যোগ্য নয় বলে মনে করত সে। এ সন্দেহ থেকেই বন্ধুর অজান্তে তার উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে ওই শিক্ষার্থী। পরে পুনঃনিরীক্ষণের ফল প্রকাশ হলে দেখা যায়, জিপিএ-৫ পাওয়া সেই শিক্ষার্থী আসলে ফেল করেছে। উত্তরপত্র মূল্যায়নে এমন বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘটনা সামনে আসার পর বিষয়টি তদন্তে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এ তথ্য জানান। এ সময় তিনি চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, পুনঃনিরীক্ষণের পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়টি।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ১৯ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ দেওয়া হলে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ লাখ খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়। এ পরিস্থিতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের মান ও নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুনঃনিরীক্ষণের ফলাফলের পরিসংখ্যান তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী জানান, প্রায় ১২ লাখ উত্তরপত্র পুনরায় যাচাইয়ের পর ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর জিপিএ পরিবর্তন হয়েছে। এ ছাড়া আগে অকৃতকার্য হওয়া প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে এবং ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের ঘটনাকে উত্তরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য অনিয়মের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রীর অভিযোগ, কিছু পরীক্ষক নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কোনো পরীক্ষক নিজেরা উত্তরপত্র মূল্যায়ন না করে অন্যদের দিয়ে খাতা দেখিয়েছেন। এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কথা জানান তিনি। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পরীক্ষক পরিবর্তন, প্রশিক্ষণ এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।

বন্ধুর উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের ঘটনাটি তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এক শিক্ষার্থী তার বন্ধুর জিপিএ-৫ পাওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। তার ধারণা ছিল, ওই বন্ধু এত ভালো ফল করার যোগ্য নয়। পরে বন্ধুর অজান্তে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হলে ফলাফলে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। শিক্ষামন্ত্রীর বর্ণনা অনুযায়ী, পুনঃনিরীক্ষণের পর ওই শিক্ষার্থীর ফল জিপিএ-৫ থেকে পরিবর্তিত হয়ে অকৃতকার্য বা ‘ফেল’ হয়।

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করার ক্ষেত্রে যাচাইকরণ কোডের ব্যবহারসংক্রান্ত ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ওই শিক্ষার্থী বন্ধুর পরিচয়ে আবেদনটি করেছিল বলে তিনি জানতে পেরেছেন। ঘটনাটি উত্তরপত্র মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্যতা এবং ফল পরিবর্তনের পেছনে সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উত্তরপত্রে প্রাপ্ত নম্বরের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের উদাহরণ দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূন্য নম্বরকে ৮৫ এবং ১৩ নম্বরকে ৮৩ নম্বর করা হয়েছে বলে তাঁর কাছে তথ্য রয়েছে। এ ধরনের পরিবর্তন কীভাবে ঘটেছে, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং মূল্যায়নের কোন পর্যায়ে অনিয়ম হয়েছে-তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা হবে বলে জানান তিনি।

শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বন্ধুর উত্তরপত্র পুনঃনিরীক্ষণের ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করতে বুধবারই মামলা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো পরীক্ষক অনিয়ম করে থাকলে তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে পরীক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং মূল্যায়নব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তবে বন্ধুর ফল পুনঃনিরীক্ষণের পর পরিবর্তিত হওয়ার ঘটনাটি এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি। সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ এবং কীভাবে নম্বরের এত বড় পরিবর্তন ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়ার কথা।