সারাবিশ্ব

ইতিহাসের নতুন অধ্যায়, প্রথমবার পৃথিবীর কক্ষপথে স্পেসএক্সের দানবীয় ‘স্টারশিপ’


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৩ পিএম

ইতিহাসের নতুন অধ্যায়, প্রথমবার পৃথিবীর কক্ষপথে স্পেসএক্সের দানবীয় ‘স্টারশিপ’
ছবি: সংগৃহীত

মহাকাশ গবেষণায় নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে স্পেসএক্সের দানবীয় মহাকাশযান ‘স্টারশিপ’। দীর্ঘ তিন বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ব্যর্থতা ও নানা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে প্রথমবারের মতো পৃথিবীর কক্ষপথে সফলভাবে পাড়ি জমিয়েছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও বৃহৎ এই রকেট। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ঐতিহাসিক ‘আর্টেমিস’ চন্দ্রাভিযান কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আগে নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও প্রস্তুতির বড় পরীক্ষা হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করে ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত স্পেসএক্সের নিজস্ব উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ‘স্টারবেস’ থেকে স্থানীয় সময় সোমবার সকালে উৎক্ষেপণ করা হয় প্রায় ৪০০ ফুট বা ১২৪ মিটার দীর্ঘ বিশালাকার স্টারশিপ। তিন বছর ধরে চলা বিভিন্ন পরীক্ষা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের পর এটি ছিল স্টারশিপের ১৪তম পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ। এর আগের কয়েকটি অভিযানে মহাকাশযান নির্ধারিত লক্ষ্যে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। কখনো মহাকাশের প্রান্তসীমায় পৌঁছানোর পর বিস্ফোরণ ঘটেছে, আবার কখনো পৃথিবীতে ফেরার পথে যানটি অগ্নিদগ্ধ হয়ে ধ্বংস হয়েছে। ফলে এবারের উৎক্ষেপণকে স্টারশিপ কর্মসূচির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

এবারের অভিযানে স্টারশিপকে প্রায় ২৭৫ কিলোমিটার বা ১৭০ মাইল উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে পৃথিবীর চারপাশে প্রায় ১০ ঘণ্টার মধ্যে ছয়টি পূর্ণ চক্কর দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এরপর নির্ধারিত মিশন পরিকল্পনা অনুযায়ী যানটির প্রশান্ত মহাসাগরে, চিলির কাছাকাছি অঞ্চলে অবতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে স্টারশিপের দীর্ঘ সময় কক্ষপথে অবস্থান, মহাকাশে বিভিন্ন প্রযুক্তি পরিচালনা এবং নিরাপদে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সক্ষমতা পরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে উৎক্ষেপণের পরপরই মিশনে তৈরি হয় চরম উত্তেজনা। রকেটের একটি ইঞ্জিন নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে গেলে মিশনের সফলতা নিয়ে সাময়িকভাবে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। মিশন কন্ট্রোলে থাকা প্রকৌশলীরা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, বন্ধ হয়ে যাওয়া ইঞ্জিনটির আর তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন নেই এবং রকেটের বাকি সিস্টেমগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। ফলে কয়েক মিনিটের টানটান উত্তেজনার পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এরপর আসে কাঙ্ক্ষিত সেই ঘোষণা। মিশন কন্ট্রোল থেকে জানানো হয়, ‘স্টারশিপ এখন কক্ষপথে’। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে উৎক্ষেপণস্থলে উপস্থিত প্রকৌশলী, কর্মী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও একাধিক ব্যর্থতার পর স্টারশিপের এই কক্ষপথ যাত্রাকে স্পেসএক্সের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এবারের মিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল স্টারলিংক স্যাটেলাইট। স্টারশিপের মাধ্যমে মহাকাশে পাঠানো হয় ২৬টি সর্বাধুনিক স্টারলিংক স্যাটেলাইট। পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব স্যাটেলাইট কক্ষপথে থাকা স্পেসএক্সের বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার কথা। এর ফলে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্টারলিংকের স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। উৎক্ষেপণের পর একে একে স্যাটেলাইটগুলো স্টারশিপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য মিশন পর্যবেক্ষণকারী প্রকৌশলী ও দর্শনার্থীরা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন।

স্টারশিপকে শুরু থেকেই সম্পূর্ণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য মহাকাশযান হিসেবে তৈরির লক্ষ্য নিয়েছে স্পেসএক্স। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে মহাকাশে মানুষ ও পণ্য পরিবহনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এবারের অভিযানে প্রথম ধাপের বিশাল বুস্টারকে স্টারবেসে ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে মেক্সিকো উপসাগরে নামিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রাখা হয়। ভবিষ্যতে এই বুস্টারকে উৎক্ষেপণস্থলে ফিরিয়ে এনে বিশাল যান্ত্রিক বাহুর সাহায্যে মাঝ আকাশ থেকে ধরে ফেলার প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করতে চায় স্পেসএক্স।

স্টারশিপের তাপ-নিরোধক ব্যবস্থাও এবারের মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আগের পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে স্পেসএক্স প্রকৌশলীরা যানটির তাপ নিরোধক বর্ম ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় মহাকাশযানকে প্রচণ্ড তাপ সহ্য করতে হয়। তাই নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসার ক্ষেত্রে এই তাপ-নিরোধক ব্যবস্থা স্টারশিপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

পরবর্তী ধাপে স্পেসএক্সের লক্ষ্য আরও উচ্চাভিলাষী। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ভবিষ্যৎ কোনো অভিযানে স্টারশিপের প্রথম ধাপের বুস্টারকে উৎক্ষেপণ প্যাডের কাছে ফিরিয়ে এনে বিশাল যান্ত্রিক বাহুর মাধ্যমে মাঝ আকাশে ধরে ফেলার চেষ্টা করা হবে। এই প্রযুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে একটি রকেটকে দ্রুত পুনরায় প্রস্তুত করে পরবর্তী মিশনে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে। এতে উৎক্ষেপণের সময় ও খরচ উভয়ই কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

নাসার চন্দ্রাভিযান কর্মসূচির জন্যও স্টারশিপের এই অগ্রগতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাসার ‘আর্টেমিস’ কর্মসূচির ভবিষ্যৎ মিশনগুলোতে চাঁদের কক্ষপথে মহাকাশচারীদের নিয়ে যাওয়া এবং চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণের ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ল্যান্ডার ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে স্পেসএক্সের স্টারশিপ লুনার ল্যান্ডার সংস্করণ নাসার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর্টেমিস কর্মসূচির পরবর্তী ধাপগুলোতে মহাকাশচারীবাহী ওরিয়ন ক্যাপসুলের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি চন্দ্রযান ও ল্যান্ডারের সমন্বয় ঘটানোর লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে স্পেসএক্সের স্টারশিপ এবং ব্লু অরিজিনের ‘ব্লু মুন’ প্রকল্পও গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ মিশনের প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সময়সূচির ওপর ভিত্তি করে চাঁদের পৃষ্ঠে মহাকাশচারীদের অবতরণের জন্য কোন ল্যান্ডার ব্যবহৃত হবে, সেটিও নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোবে।

মানুষকে আবার চাঁদের মাটিতে ফিরিয়ে নেওয়ার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই নাসা আর্টেমিস কর্মসূচি পরিচালনা করছে। দীর্ঘদিন পর চাঁদের পৃষ্ঠে মানুষের প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে চাঁদকে কেন্দ্র করে আরও দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ গবেষণা ও গভীর মহাকাশ অভিযানের ভিত্তি তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। আর সেই পরিকল্পনায় স্পেসএক্সের স্টারশিপ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাই ছিল এই কক্ষপথ যাত্রা।

একাধিক ব্যর্থতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর স্টারশিপের প্রথম সফল কক্ষপথ যাত্রা তাই শুধু স্পেসএক্সের জন্য নয়, বেসরকারি মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এখন নজর থাকবে পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে-স্টারশিপ কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে কক্ষপথে কাজ করতে পারে, নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরতে পারে এবং ভবিষ্যতে চন্দ্রাভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারে কি না, সেটিই হবে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।