সারাদেশ
ছেলে কৃষি কর্মকর্তা, বাবা পেলেন সারের ডিলারশিপ
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছেলের প্রভাব খাটিয়ে তাঁর বাবাকে সারের ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার তমরদ্দি ইউনিয়নে ‘মেসার্স আইমান এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন মো. আব্দুল বাতেন। তাঁর ছেলে মোহাম্মদ দাউদ একই উপজেলায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষি বিভাগে ছেলের কর্মরত থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তার ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে ডিলারশিপটি পেয়েছেন আব্দুল বাতেন। একই উপজেলায় কৃষি বিভাগের দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তার বাবাকে সারের ডিলার হিসেবে মনোনীত করায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের মতে, এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত এড়ানো এবং যোগ্য প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে বাবার ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ দাউদ। তিনি বলেন, ‘অনেকে আবেদন করেছেন, আবার অনেকে মনোনীত হননি। আমার বাবার কাগজপত্র নিয়ম অনুযায়ী সঠিক থাকায় তিনি মনোনীত হয়েছেন। তিনি একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি এবং নিজের ওপর নির্ভরশীল। আমি একটি ছোট পদে চাকরি করি, নিয়োগকর্তা নই। উপজেলা, জেলা ও সচিবালয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর এ নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। এতে আমার কোনো ভূমিকা বা হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।’
অভিযোগের বিষয়ে মো. আব্দুল বাতেন বলেন, ব্যবসার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রয়োজনীয় ও বৈধ সব কাগজপত্র জমা দিয়েই তিনি ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করেই তাঁকে মনোনীত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছেলের প্রভাব খাটানোর কোনো বিষয় নেই।
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল বাছেদ সবুজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, নোয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশীষ কুমার কর জানিয়েছেন, সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এখনো কারও সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন করা হয়নি। প্রাপ্ত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের মনোনয়ন বাতিল করা হবে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, হাতিয়ায় সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। এর আগে উপজেলার চরকিং ইউনিয়নে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার গুদাম না থাকা সত্ত্বেও ‘মেসার্স ওয়াসিম এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী মো. আক্তার হোসেনকে ডিলার হিসেবে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা মো. মনির উদ্দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, নীতিমালা অনুযায়ী সার ডিলারের গুদামের ন্যূনতম ধারণক্ষমতা ২৫ মেট্রিক টন হওয়া প্রয়োজন। অথচ উপজেলা প্রকৌশলীর প্রত্যয়নপত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত গুদামটির আয়তন মাত্র ৩২২ বর্গফুট; দৈর্ঘ্য ২৩ ফুট এবং প্রস্থ ১৪ ফুট। অভিযোগকারীর দাবি, এ আয়তনের গুদাম নির্ধারিত ধারণক্ষমতার শর্ত পূরণ করে কি না, তা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
হাতিয়ার একাধিক ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ ওঠায় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে তমরদ্দি ইউনিয়নের ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি বা অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র যাচাইয়ের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।