সারাবিশ্ব

ট্রাম্পের চাপ উপেক্ষা করে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা ইউক্রেনের


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম

ট্রাম্পের চাপ উপেক্ষা করে রাশিয়ার তেল স্থাপনায় হামলা ইউক্রেনের
ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে চাপের মধ্যেই রাশিয়ার সামারা অঞ্চলের একটি তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে ইউক্রেন। একই সময়ে রাশিয়ার একটি ড্রোন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চের চত্বরে আঘাত হেনেছে। হামলার পর সেখানে আগুন লাগলেও গবেষণা চুল্লি ও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার সামারা অঞ্চলের একটি তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে দূরপাল্লার হামলা চালিয়েছে। তাঁর দাবি, রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে ইউক্রেন রাশিয়ার ভেতরে দূরপাল্লার হামলা অব্যাহত রাখবে।

জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কমাতে ইউক্রেনীয় বাহিনী নিয়মিতভাবে রুশ সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সামারা অঞ্চলের তেল স্থাপনার পাশাপাশি কৃষ্ণসাগর এলাকায় একটি লক্ষ্যবস্তু, রাশিয়ার ওরিওল অঞ্চলে ড্রোন উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত একটি স্থাপনা এবং ব্রায়ানস্ক অঞ্চলে রুশ বাহিনীর একটি সরবরাহকেন্দ্রেও হামলা চালানো হয়েছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেওয়াই ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলার অন্যতম লক্ষ্য। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করে যুদ্ধের সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করছে কিয়েভ।

সামারা অঞ্চলে আগেও ইউক্রেনের হামলা

রাশিয়ার সামারা অঞ্চল ইউক্রেনের জন্য নতুন কোনো লক্ষ্য নয়। এর আগেও অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে সামারা ও উফার বড় তেল শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে ইউক্রেনীয় হামলার দাবি করা হয়েছিল।

সামারা অঞ্চলের কুইবিশেভ তেল শোধনাগারটি ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে প্রায় ৯১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ফলে সেখানে হামলা চালানোর দাবি ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন সক্ষমতার বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে আসে।

রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলার পেছনে জ্বালানি সরবরাহ ও রুশ যুদ্ধ অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্য রয়েছে বলে কিয়েভ দাবি করে। অন্যদিকে মস্কোও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে।

জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টাপাল্টি হামলা

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি অবকাঠামো আবারও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জ্বালানি ডিপো ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। বিপরীতে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে।

৩০ সেপ্টেম্বর রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, হামলার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল কিয়েভ ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামো। হামলায় কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং হতাহতের ঘটনাও ঘটে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, ওই হামলায় ২৮৫টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল এবং কয়েকটি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে অবশ্য এসব হামলার লক্ষ্য হিসেবে সামরিক যোগাযোগকেন্দ্র, জ্বালানি স্থাপনা ও বন্দর অবকাঠামোর কথা বলা হয়েছে।

এ অবস্থায় রাশিয়ার ভেতরে ইউক্রেনের তেল স্থাপনায় নতুন হামলা এবং ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় রুশ হামলা-দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি আঘাতকে আরও তীব্র করে তুলছে।

কিয়েভের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে রুশ ড্রোন

এদিকে ৩০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কিয়েভের ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চের চত্বরে একটি রুশ ড্রোন আঘাত হানে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ১৮ মিনিটে ড্রোনটি ওই প্রতিষ্ঠানের এলাকায় আঘাত করে। সেখানে কিয়েভ রিসার্চ রিঅ্যাক্টর বা VVR-M গবেষণা চুল্লি রয়েছে।

ড্রোন আঘাতের পর প্রতিষ্ঠানটির এলাকায় আগুন ধরে যায়। তবে জরুরি কর্মীরা দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে জানানো হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হামলায় গবেষণা চুল্লি এবং এর গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। পারমাণবিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, হামলার পরও তেজস্ক্রিয়তার মাত্রায় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি এবং তা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পটভূমি মাত্রার মধ্যেই রয়েছে। হামলার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে তদন্ত ও মূল্যায়ন চলছে।

কিয়েভের এই VVR-M গবেষণা চুল্লির ক্ষমতা প্রায় ১০ মেগাওয়াট। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত বড় বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লির তুলনায় অনেক ছোট। গবেষণা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন কাজে এটি ব্যবহৃত হয়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চুল্লিটি বন্ধ অবস্থায় রয়েছে এবং এর কোরও খালি করা হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

ইউক্রেনের পারমাণবিক স্থাপনা ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই ইউক্রেনের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা ২০২২ সাল থেকে রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে পারমাণবিক স্থাপনার আশপাশে সামরিক কর্মকাণ্ড, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে, পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি সামরিক হামলা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে কিয়েভের গবেষণা চুল্লিতে সর্বশেষ হামলার পর তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা স্বাভাবিক থাকা এবং চুল্লি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা অক্ষত থাকার বিষয়টি আপাতত বড় ধরনের পারমাণবিক ঝুঁকি তৈরি হয়নি বলেই ইঙ্গিত করছে।

শীতের আগে আরও তীব্র হতে পারে জ্বালানি যুদ্ধ

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলা এমন এক সময়ে বাড়ছে, যখন ইউক্রেন শীত মৌসুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের রুশ হামলায় ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে এবং কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় জরুরি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতে হয়েছে।

অন্যদিকে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুদ্ধের সামরিক ফ্রন্টের পাশাপাশি দুই দেশের জ্বালানি অবকাঠামোও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।

সামারা অঞ্চলের তেল স্থাপনায় ইউক্রেনের সর্বশেষ হামলা এবং কিয়েভের পারমাণবিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চত্বরে রুশ ড্রোন আঘাতের ঘটনা সেই পাল্টাপাল্টি হামলার নতুন মাত্রাই সামনে এনেছে। যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে সংঘাত কমানোর চেষ্টা চললেও মাটিতে ও আকাশে দুই পক্ষের হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে।