সারাবিশ্ব
ঘাটালে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি, পানির নিচে শহর-গ্রাম; চরম দুর্ভোগে মানুষ
পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটালে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। একটানা ভারী বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি স্থানীয় শিলাবতী ও ঝুমি নদীর পানির স্তর বেড়ে যাওয়ায় ঘাটাল শহর ও পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত পানির নিচে চলে গেছে। পৌর এলাকার একাধিক ওয়ার্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেও দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতি।
ঘাটালের বহু বহুতল ভবনের নিচতলা ইতোমধ্যেই পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় ও রাজ্য সড়কের বিস্তীর্ণ অংশও পানির নিচে থাকায় স্বাভাবিক যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। যে সড়কগুলোতে স্বাভাবিক সময়ে সাইকেল, বাস, সিএনজি ও অন্যান্য মোটরচালিত যান চলাচল করত, সেসব সড়কেই এখন বিকল্প যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নৌকা ব্যবহার করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও মানুষকে কোমরসমান পানির মধ্য দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। পানিতে রাস্তা, খেলার মাঠ ও পুকুর একাকার হয়ে যাওয়ায় কোনটি স্থলভাগ আর কোনটি জলাশয়-তা বোঝাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বন্যার কারণে ঘাটালের বিভিন্ন স্কুল, কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা চলমান থাকায় বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কয়েকটি পরীক্ষা কেন্দ্র ঘাটাল রবীন্দ্র শতবার্ষিকী কলেজে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে, অনেক এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার রাস্তাও পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে কিছু শিক্ষার্থীকে ঝুঁকি নিয়ে পানির মধ্য দিয়েই স্কুল-কলেজে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
বন্যার পানিতে এলাকার অনেক পানির কল ও পানির উৎস ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট। দুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গা ও বিভিন্ন ত্রাণশিবিরে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রশাসন ও বিভিন্ন পক্ষের উদ্যোগে খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিঘের পর বিঘে চাষের জমি। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গবাদিপশু নিয়েও সমস্যায় পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গরু, বাছুরসহ অন্যান্য পশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাপসহ বিভিন্ন বিষাক্ত কীটপতঙ্গের উপদ্রবও বেড়েছে। ফলে দিন-রাত আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন পানিবন্দি মানুষ।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ঘাটালের বিজেপি বিধায়ক শীতল কপাট। সোমবার তিনি জানান, বন্যা পরিস্থিতির বিষয়ে রাজ্য সরকার সচেতন রয়েছে। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে পরিস্থিতির তদারকি করছেন। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বন্যাকবলিত এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। পানি-কবলিত এলাকায় স্কুলশিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার জন্য নৌকা ও ইজিবাইকের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ রয়েছে। দুর্গত এলাকার মানুষ বলছেন, প্রতিবছর বর্ষা এলেই তাদের নতুন করে বন্যার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, গবাদিপশু ও দৈনন্দিন জীবন-সবকিছুই পানির কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পানিবন্দি অবস্থায় কীভাবে দিন কাটছে, সেই দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শ্যামপুর অঞ্চলের বাসিন্দা মিতা মণ্ডল জানান, বন্যার কারণে রোগী ও গবাদিপশু নিয়ে চরম সমস্যার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। বিশেষ করে গরু-বাছুরসহ পশুদের নিরাপদে রাখা এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। তাঁর দাবি, এই সমস্যা নতুন নয়; দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে এলাকায় বসবাস করেও প্রতিবছরই তাদের একই ধরনের দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে।
মিতা মণ্ডলের দাবি, ঘাটালের দীর্ঘদিনের বন্যা সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে বন্যা নিয়ন্ত্রণে মাস্টার প্ল্যান দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, ঘাটালের বন্যা পরিস্থিতি শুধু যোগাযোগ ও জনজীবনকেই বিপর্যস্ত করেনি, এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষা, কৃষি, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্য ও গবাদিপশুর ওপরও। পানির স্তর আরও বাড়লে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।