সারাদেশ
সাবেক উপমন্ত্রী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই আর নেই
মুন্সীগঞ্জের প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক উপমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের সাবেক প্যানেল স্পিকার ও বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ আব্দুল হাই (৭৭) মারা গেছেন। বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তাঁর মৃত্যুতে মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য, উপমন্ত্রী ও প্যানেল স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিএনপির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আব্দুল হাই। তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন সহজ-সরল জীবনযাপন, স্পষ্ট বক্তব্য এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার জন্য।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে আব্দুল হাইয়ের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে মুন্সীগঞ্জে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হবে।
১৯৪৯ সালের ৫ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুল হাই। তাঁর বাবা মনির উদ্দিন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তাঁর স্ত্রীর নাম জামিলা খাতুন। তিনি দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। তাঁর বড় ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আব্দুল হাই মুন্সীগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মুন্সীগঞ্জ সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রাখেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন আব্দুল হাই। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়েও কোষাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় পর্যায়ে তাঁর দীর্ঘ পথচলা তাঁকে মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সংসদীয় রাজনীতির সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, একই বছরের ১২ জুন এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জয়ী হন তিনি। সব মিলিয়ে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আব্দুল হাই। তিনি বিভিন্ন সময়ে মুন্সীগঞ্জ-৪ আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ঢাকা-৮ আসনের প্রতিনিধিত্বের তথ্যও উল্লেখ রয়েছে।
জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী নিযুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদে প্যানেল স্পিকার নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য ও উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিলেন তিনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য, উপমন্ত্রী ও প্যানেল স্পিকার-বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আব্দুল হাইয়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন মুন্সীগঞ্জের রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন প্রবীণ নেতার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটল। তাঁর প্রয়াণে রাজনৈতিক সহকর্মী, অনুসারী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।