সারাবিশ্ব

চীনের সামরিক নেতৃত্বে বড় শুদ্ধি অভিযান, যুদ্ধের সক্ষমতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৭ পিএম

চীনের সামরিক নেতৃত্বে বড় শুদ্ধি অভিযান, যুদ্ধের সক্ষমতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত

চীনের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে ধারাবাহিক শুদ্ধি অভিযান নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে। একের পর এক অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তাকে অপসারণের ফলে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) নেতৃত্ব কাঠামো, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে একই সঙ্গে এই অভিযান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সেনাবাহিনীর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ বলেও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো চীনের দুই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা-জেনারেল ঝাং ইউশিয়া ও জেনারেল লিউ ঝেনলির-কমিউনিস্ট পার্টি ও সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কার। ২১ সেপ্টেম্বর চীনা কর্তৃপক্ষ জানায়, দীর্ঘ তদন্তের পর তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ, রাজনৈতিক অবিশ্বস্ততা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের মামলাগুলো সামরিক প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

পিএলএর শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধাক্কা

ঝাং ইউশিয়া ছিলেন চীনের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (CMC) ভাইস চেয়ারম্যান এবং সামরিক কমান্ড কাঠামোয় শি জিনপিংয়ের পর অন্যতম ক্ষমতাধর কর্মকর্তা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং চীনা সামরিক নেতৃত্বের হাতে গোনা কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে ছিলেন, যাঁদের সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও ছিল।

অন্যদিকে লিউ ঝেনলি ছিলেন কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের জয়েন্ট স্টাফ বিভাগের প্রধান। ফলে একই সময়ে এই দুই শীর্ষ কর্মকর্তার পতন পিএলএর সর্বোচ্চ কমান্ড কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ধারাবাহিক তদন্ত ও অপসারণের ফলে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের আগে সাত সদস্যের কাঠামোতে সক্রিয় সদস্যের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শুধু দুর্নীতি নয়, ‘অবিশ্বস্ততার’ অভিযোগও

চীনা কর্তৃপক্ষ ঝাং ও লিউয়ের বিরুদ্ধে শুধু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগই আনেনি। তাঁদের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘন, নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বস্ততা এবং গোষ্ঠী বা উপদল তৈরি করার অভিযোগও আনা হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার বরাতে এপি জানিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্যদের পদোন্নতিতে সহায়তা এবং এর বিনিময়ে বিপুল অর্থ ও উপহার গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পরিবারের সদস্যদের কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে তদারকি না করার অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে ‘অবিশ্বস্ততা’ এবং ‘গোষ্ঠী ও উপদল তৈরি’র অভিযোগ। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের কয়েকজন মনে করছেন, চীনের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এ ধরনের রাজনৈতিক অভিযোগ সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে আনুগত্য ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

শি জিনপিংয়ের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হচ্ছে?

শি জিনপিং ২০১২ সালে চীনের ক্ষমতার শীর্ষে আসার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে আসছেন। সামরিক বাহিনীও এই অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। গত কয়েক বছরে পিএলএর একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তদন্ত, অপসারণ ও বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন।

চীনা সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই অভিযান মূলত সামরিক বাহিনীর দুর্নীতি দূর করা, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। শি জিনপিং বারবার সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের ওপর জোর দিয়েছেন।

তবে বাইরের বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, এর রাজনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হলে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশন এবং সামগ্রিকভাবে পিএলএর ওপর শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় হতে পারে। একই সঙ্গে বাহিনীর অভ্যন্তরে সম্ভাব্য ক্ষমতার কেন্দ্র বা বিকল্প প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুযোগও কমে যেতে পারে।

যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতায় কি প্রভাব পড়বে?

শীর্ষ পর্যায়ে দ্রুত এবং ধারাবাহিক পরিবর্তন সামরিক বাহিনীর স্বল্পমেয়াদি প্রস্তুতিতে কিছু প্রভাব ফেলতে পারে-এমন আলোচনা রয়েছে। একটি বড় সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কমান্ডার, দীর্ঘদিনের পারস্পরিক সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং কমান্ড কাঠামোর স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে একই সময়ে একাধিক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিলে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে সময় লাগতে পারে। যুদ্ধের মতো জটিল পরিস্থিতিতে বাহিনীর বিভিন্ন শাখা-স্থল, নৌ, বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য ইউনিটের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বয় প্রয়োজন হয়। ফলে নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন সাময়িকভাবে অপারেশনাল প্রস্তুতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

তবে এই শুদ্ধি অভিযানকে সরাসরি চীনের সামরিক শক্তি কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। চীনের সামরিক সক্ষমতা শুধু কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নির্ভরশীল নয়। দেশটির বিশাল সামরিক অবকাঠামো, অস্ত্র ও প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সামরিক কমান্ড কাঠামোও এর অংশ। তাই নেতৃত্বে পরিবর্তন মানেই চীন বড় ধরনের যুদ্ধ পরিচালনায় অক্ষম হয়ে গেছে-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

তাইওয়ানকে ঘিরে বাড়ছে গুরুত্ব

চীনের সামরিক নেতৃত্বে এই পরিবর্তন এমন সময়ে ঘটছে, যখন তাইওয়ানকে ঘিরে বেইজিংয়ের সামরিক তৎপরতা নিয়ে আঞ্চলিক উদ্বেগ রয়েছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি ব্যবহারের পথও খোলা রেখেছে। অন্যদিকে তাইওয়ান নিজস্ব সরকার ও সামরিক বাহিনী নিয়ে স্বশাসিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও চীনের সামরিক নেতৃত্বে শুদ্ধি অভিযানের কারণে দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে তাইওয়ান চীনের বিমান ও সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তবে চীনের সামরিক কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক অপসারণ থেকে তাইওয়ানকে ঘিরে বেইজিংয়ের ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। নেতৃত্ব পরিবর্তন, সামরিক মহড়া এবং প্রকৃত যুদ্ধের প্রস্তুতি-এই তিনটি বিষয়কে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদে কী হতে পারে?

চীনের সামরিক বাহিনীতে চলমান শুদ্ধি অভিযানকে তাই একই সঙ্গে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে এটি পিএলএর শীর্ষ কমান্ডে অভিজ্ঞতার ঘাটতি, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং সমন্বয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে শি জিনপিংয়ের লক্ষ্য যদি হয় আরও রাজনৈতিকভাবে অনুগত, নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সামরিক নেতৃত্ব তৈরি করা, তাহলে নতুন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সেই কাঠামো আরও শক্তিশালী হতে পারে।

রয়টার্সের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ঝাং ইউশিয়ার মতো একজন দীর্ঘদিনের সামরিক অভিজ্ঞ ও শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক অবিশ্বস্ততার অভিযোগ চীনের সামরিক নেতৃত্বে চলমান পরিবর্তনের গভীরতাকে তুলে ধরে।

সব মিলিয়ে, চীনের সামরিক বাহিনীতে চলমান শুদ্ধি অভিযানকে শুধু দুর্নীতিবিরোধী অভিযান হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এটি একই সঙ্গে পিএলএর নেতৃত্ব কাঠামো পুনর্গঠন, রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করা এবং শি জিনপিংয়ের সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করার একটি বড় প্রক্রিয়া। এই পরিবর্তনের ফলে চীনের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা স্বল্পমেয়াদে কীভাবে প্রভাবিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে নতুন নেতৃত্ব কতটা কার্যকরভাবে বাহিনী পরিচালনা করতে পারে-সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের নজর।