সারাবিশ্ব

ইতিহাসের পাতায় পালিয়ে যাওয়া যেসব রাষ্ট্রপ্রধান, ক্ষমতায় ফেরাও ইতিপূর্বে নেই


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৩৪ পিএম

ইতিহাসের পাতায় পালিয়ে যাওয়া যেসব রাষ্ট্রপ্রধান, ক্ষমতায় ফেরাও ইতিপূর্বে নেই
ছবি: সংগৃহীত

ক্ষমতা যতই বিস্তৃত হোক না কেন, জনরোষের সামনে তা এক সময় হয়ে পড়ে ঠুনকো। ইতিহাসের বহু অধ্যায়ে এমন অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের নাম উঠে এসেছে, যারা এক সময় ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায়, আর এক সময় পালিয়ে বেড়িয়েছেন নিজের প্রাণ রক্ষায়।

কেউ গণঅভ্যুত্থানের মুখে, কেউ আন্তর্জাতিক চাপে, আবার কেউ সেনা অভ্যুত্থানের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আজ আমরা ফিরে দেখব সেইসব নেতাদের কথা—যারা ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শাসক হিসেবে।

মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি (ইরান): ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ঢেউয়ে শাহ পাহলভি ১৯৭৯ সালে দেশত্যাগ করেন। জীবনের শেষ বছরগুলো কাটান বিভিন্ন দেশে ঘুরে, অবশেষে কায়রোতে মৃত্যু হয় ১৯৮০ সালে।

ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ (ইউক্রেন): ২০১৪ সালে ইউক্রেনে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ায় প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে শুরু হয় গণবিক্ষোভ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে তিনি কিয়েভ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে পার্লামেন্ট তাকে বরখাস্ত করে এবং তিনি রাশিয়ায় আশ্রয় নেন।

ইদি আমিন (উগান্ডা): সত্তরের দশকে উগান্ডায় একচ্ছত্র ক্ষমতা চালানো স্বৈরশাসক ইদি আমিনের শাসনকাল ছিল ভয়াবহ নিপীড়ন আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ। ১৯৭৯ সালে বিদ্রোহ ও জনরোষের মুখে তিনি লিবিয়া হয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। বিলাসবহুল জীবন কাটিয়ে ২০০৩ সালে রিয়াদে মৃত্যুবরণ করেন।

বেন আলী (তিউনিসিয়া): আরব বসন্তের প্রথম আলোড়নে ২০১১ সালে ক্ষমতা হারান তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জিনে এল-আবিদিন বেন আলী। ২৩ বছরের শাসনের ইতি টেনে তিনি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। সেখানেই গোপনীয় পরিবেশে জীবন কাটান এবং ২০১৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

আশরাফ ঘানি (আফগানিস্তান): ২০২১ সালে তালেবান যখন রাজধানী কাবুলের দিকে অগ্রসর হয়, তখন প্রেসিডেন্ট ঘানি পালিয়ে যান। পরে জানা যায় তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করছেন। তিনি দাবি করেন, রক্তপাত এড়াতেই তিনি দেশ ছেড়েছেন।

ফার্দিনান্ড মার্কোস (ফিলিপিন্স): ১৯৮৬ সালে ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে মার্কোস ক্ষমতা হারান। মার্কিন সহায়তায় তিনি গুয়ামে যান, পরে হাওয়াইতে স্থায়ী হন। ১৯৮৯ সালে সেখানেই মারা যান।

নওয়াজ শরীফ (পাকিস্তান): তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ১৯৯৯ সালে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে সৌদি আরবে নির্বাসনে যান। পরে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৯ সালে লন্ডন যান এবং ২০২৩ সালে দেশে ফেরেন।

পারভেজ মুশাররফ (পাকিস্তান): নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় বসা জেনারেল মুশাররফ ২০০৮ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন। ফিরে এসে গ্রেফতার হন, পরে আবার চিকিৎসার অজুহাতে দুবাই যান। ২০২৩ সালে সেখানেই মারা যান।

থাকসিন শিনাওয়াত (থাইল্যান্ড): ২০০৬ সালে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারান থাকসিন। পরে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে লন্ডনে চলে যান। দীর্ঘ ১৫ বছর পর ২০২৩ সালে তিনি দেশে ফেরেন।

চার্লস টেলর (লাইবেরিয়া): ২০০৩ সালে গৃহযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তিনি দেশ ছাড়েন। পরে যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ৫০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তার বিচার হয় দ্য হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে।

গোটাবায়া রাজাপাকশা (শ্রীলঙ্কা): ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের জেরে গোটাবায়া দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি সিঙ্গাপুর হয়ে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেন। পরে দুই মাস পর দেশে ফেরেন।

শেখ হাসিনা (বাংলাদেশ): ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে বাংলাদেশজুড়ে ভয়াবহ গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ৫ আগস্টের 'জুলাই গণহত্যা'র রেশ না কাটতেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপনে দেশ ত্যাগ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর সেনাবাহিনী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে।

পালিয়ে যাওয়া রাষ্ট্রপ্রধানদের এই তালিকা প্রমাণ করে যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়—বিশেষত যখন তা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ইতিহাস এসব ঘটনাকে শুধু রাজনীতির পাঠ নয়, বরং শাসকদের জন্য এক নির্মম শিক্ষা হিসেবেও তুলে ধরে। দেশত্যাগের পর এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরারও ইতিহাস নেই।