সারাবিশ্ব

ট্রাম্প-শি বৈঠকে বড় ছাড় নয়, কূটনীতির মঞ্চে এগিয়ে চীন?


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১২ পিএম

ট্রাম্প-শি বৈঠকে বড় ছাড় নয়, কূটনীতির মঞ্চে এগিয়ে চীন?
ছবি: সংগৃহীত

ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠক শেষ হলেও দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বিরোধে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা, লালগালিচা সংবর্ধনা এবং দুই নেতার উষ্ণ কূটনৈতিক বার্তার আড়ালে বাস্তব অর্জনের পরিমাণ ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। এ কারণে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, দৃশ্যত ফলাফল সীমিত হলেও বৈঠকটি কূটনৈতিক ও প্রচারণামূলক দিক থেকে চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করেছে।

চলতি বছরের মে মাসে বেইজিংয়ে দুই নেতার বৈঠকের পর ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ, শুল্কনীতি, বিরল মৃত্তিকা খনিজ, কৃষিপণ্য, প্রযুক্তি এবং তাইওয়ান ইস্যুতে বড় ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পরও দুই দেশের মধ্যকার মৌলিক বিরোধগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

বৈঠকে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কিছু অসংবেদনশীল পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। একই সঙ্গে একটি বিস্তৃত বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর সময়সীমাও আগামী বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের বড় ধরনের পরিবর্তনের বদলে আপাতত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই বৈঠকটিকে দেখা হচ্ছে।

বৈঠকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বড় কোনো চীনা ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের অনুপস্থিতি। দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে পারস্পরিক অবিশ্বাস রয়েছে, এই ঘটনা তারই একটি প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর ফলে আগে আলোচিত যৌথ বিনিয়োগ পরিকল্পনাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে কূটনৈতিক সৌজন্যের ক্ষেত্রে শি জিনপিংকে স্বাগত জানাতে ট্রাম্প প্রশাসন ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। ট্রাম্প নিজেই বিমানবন্দরে গিয়ে শি জিনপিংকে স্বাগত জানান, যা দীর্ঘ সময় পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এমন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিগত অভ্যর্থনার নজির হিসেবে আলোচিত হয়েছে। পরে হোয়াইট হাউসে শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত নৈশভোজেও দুই নেতার সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়।

নৈশভোজে ট্রাম্প দাবি করেন, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন হলো—ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতার বিপরীতে বাস্তব নীতিগত ছাড় কতটা মিলেছে? তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যাপক কূটনৈতিক সৌজন্য প্রদর্শিত হলেও চীন বড় কোনো দৃশ্যমান রাজনৈতিক বা কৌশলগত ছাড় দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। ফলে সম্মেলনের প্রতীকী সুবিধার বড় অংশ বেইজিং পেয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

চীনের হাতে থাকা অর্থনৈতিক শক্তিও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে বিরল মৃত্তিকা খনিজের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চীনের শক্তিশালী অবস্থান বেইজিংকে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেয়। তথ্যপ্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, অটোমোবাইল এবং প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খাতে এসব খনিজের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন শুল্কনীতির চাপ থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে চীনের সামগ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত একটি বড় ধরনের চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য বেইজিংয়ের ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। চীন তার বৈশ্বিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও বিকল্প বাজার ধরে রাখতে পারলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় আরও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের সুযোগ পাবে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রও পুরোপুরি খালি হাতে ফিরেছে-এমনটি বলা যায় না। মার্কিন কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু কৃষিপণ্যের ওপর চীনা শুল্ক কমানোর প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে ভুট্টা ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো কৃষিপণ্য রয়েছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রও চীনের কিছু ভোক্তা পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন কৃষকদের ওপর বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব কমাতে এ ধরনের পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে এই সমঝোতার মধ্যেও বড় একটি উদ্বেগ থেকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য সয়াবিনকে চীনের শুল্কছাড়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ উল্লেখ করছেন। ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের আবার অবনতি হলে মার্কিন সয়াবিন রপ্তানি নতুন করে চাপের মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ কৃষি খাতে সাময়িক স্বস্তি এলেও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর হয়নি।

বাণিজ্যের বাইরে ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট মোকাবিলায় চীনকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে রাজি করাতে ওয়াশিংটন সক্ষম হয়েছে-এমন কোনো স্পষ্ট বার্তা বৈঠক থেকে আসেনি। বরং হোয়াইট হাউসে দুই নেতার বৈঠকের পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং ইরান ও কিউবার প্রতি মার্কিন নীতির সমালোচনা করেন। এতে দুই দেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য যে এখনও স্পষ্ট, সেটিই আবার সামনে এসেছে।

সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি ছিল তাইওয়ান। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়টিকে চীনের সঙ্গে দরকষাকষির একটি উপাদান হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু এবারের বৈঠনে তাইওয়ান ইস্যু প্রকাশ্যে আলোচনার কেন্দ্রে না এনে দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই নেতার মধ্যে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রাখা দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই নীতির ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। কিছু কূটনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে চীন সময় নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে তাইওয়ানের কাছে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ বা অন্যান্য কৌশলগত সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যাকে একটি বিশ্লেষণমূলক অবস্থান হিসেবেই দেখা উচিত; বৈঠকটি নিজেই এমন কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি যে তাইওয়ানে অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্প-শি বৈঠকে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের মৌলিক বিরোধের অবসান ঘটেনি। বরং দুই দেশ বাণিজ্যযুদ্ধ ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যেও যোগাযোগের পথ খোলা রাখার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র কিছু কৃষিপণ্যের বাজারে স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও চীন বিরল মৃত্তিকা খনিজ, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক প্রভাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।

তাই এই সম্মেলনকে একতরফাভাবে কোনো পক্ষের পূর্ণাঙ্গ বিজয় বা পরাজয় হিসেবে দেখার চেয়ে বরং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাময়িক উত্তেজনা প্রশমনের একটি কূটনৈতিক পর্ব হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে সম্মেলনের প্রতীকী দিক, দুই নেতার পারস্পরিক সৌজন্য এবং বড় কোনো কৌশলগত ছাড় না দেওয়ার বিষয়গুলো বেইজিংকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে-এমন মূল্যায়নও রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বৈঠকে ঘোষিত সমঝোতাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়।