জাতীয়

সীমান্তে 'পুশ ইন' ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন, নীরব রাজনৈতিক মহল


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৫, ০৯:২৬ এএম

সীমান্তে 'পুশ ইন' ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন, নীরব রাজনৈতিক মহল
ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ভারত সরকারের নির্দেশে দেশটির বিভিন্ন রাজ্য থেকে হাজার হাজার সন্দেহভাজন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের গোপনে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠানো হয়েছে।

শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা মুসলিমদেরও আন্দামান সাগরে নামিয়ে মিয়ানমারের দিকে সাঁতরে যাওয়ার জন্য বাধ্য করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পদক্ষেপকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।

বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়, বরং এটি ভারতের একটি সুপরিকল্পিত ও কৌশলগত পদক্ষেপ, যা আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার রীতিনীতি এবং এমনকি ভারতের নিজস্ব সংবিধানের বিরোধী। ‘সাউথ এশিয়া হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টেশন সেন্টার’-এর রবি নায়ার একে "লোকজনকে অপহরণ করে সীমান্তে ফেলে দেওয়া" বলেই অভিহিত করেছেন।

কীভাবে চলছে এই ‘পুশ ইন’ অপারেশন?

দিল্লি, গুজরাট, কর্নাটকসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের আটক করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে আনা হচ্ছে। এরপর বিএসএফ (ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী) রাতের অন্ধকারে কিংবা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে। ৩ জুলাই গুজরাট থেকে ২৫০ জন লোককে এইভাবে সীমান্তে পাঠানো হয়েছে বলে জানা যায়।

ভারতের এই কৌশলের পেছনে কারণ কী?

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ:

১. পশ্চিমা বিশ্বের নীরবতা: মানবাধিকার আইনজীবী নন্দিতা হাকসার বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো নিজেরাই অভিবাসীবিরোধী অবস্থানে আছে। তাই ভারত জানে, তাদের এই আচরণের বিরুদ্ধে কোনো জোরালো প্রতিবাদ হবে না।

২. বাংলাদেশের প্রতি রাজনৈতিক বার্তা: সাবেক কূটনীতিক পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মাঝে যে শীতলতা এসেছে, এই ‘পুশ ইন’ এর মাধ্যমে ভারত একটি কৌশলগত বার্তা দিচ্ছে।

৩. জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত: বিজেপি ঘনিষ্ঠ চিন্তাবিদ শুভ্রকমল দত্তের ভাষায়, "অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ফিরিয়ে দেওয়া হলে সেটা নিয়ম লঙ্ঘন হলেও, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তা মেনে নেওয়া যায়।"

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন স্বীকার করেছেন, ভারতের এই কর্মকাণ্ড ঠেকানোর বাস্তব কোনো সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। অথচ এই স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো থেকেও কোনো প্রতিবাদ বা অবস্থান দেখা যাচ্ছে না, যা হতাশাজনক।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, বাংলাভাষী মুসলিমদের টার্গেট করে এই অভিযান বিজেপির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অংশ হতে পারে। অথচ ভারত সরকার কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পুশ ইন’ স্বীকার করে না। কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সংক্ষিপ্তভাবে জানায়, “আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নিষ্পাপ মানুষের জীবন নিয়ে রাজনীতি কতকাল?

এই সমস্ত ঘটনার প্রেক্ষাপটে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে—অবৈধভাবে সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেওয়া, আন্তর্জাতিক আইন ভাঙা, সংবিধান উপেক্ষা করা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন—সবই যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। অবৈধ অভিবাসনের মতো একটি গুরুতর ইস্যুকে কেন্দ্র করে নিষ্পাপ মানুষের জীবন নিয়ে এভাবে রাজনৈতিক খেলা কতদিন চলবে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই নিষ্ঠুরতা কবে থামবে?