জাতীয়

৬ মাসে পারিবারিক সহিংসতায় খুন তিন শতাধিক নারীর


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:০০ এএম

৬ মাসে পারিবারিক সহিংসতায় খুন তিন শতাধিক নারীর
ছবিঃ সংগৃহীত

পারিবারিক কলহ থেকে বিরোধ, আর সেই বিরোধই গড়াচ্ছে হত্যাকাণ্ডে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩ শতাধিক নারী। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও ২ শতাধিক।

রাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পর নারীর নিরাপত্তা ও পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

রাজধানীর উত্তরার দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ এলাকায় গত ৩০ জুলাই নিজ বাসায় বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় দন্ত চিকিৎসক সারা রোকসানা পিনুকে। ঘটনার পর তদন্তে নামে পুলিশ। জুতার ছাপসহ বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে তাঁর স্বামী সোহেলের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ তৈরি হয়। পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পারিবারিক কলহের বিষয়টি উঠে এসেছে। নিহতের বোনের অভিযোগ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে তাঁর বোনকে হত্যা করা হয়েছে।

নিহতের বোন সারাহ সুলতানা পলি বলেন, ‘আমার বোনের জীবন শেষ করতে করতে তিলে তিলে ধরতে হইবো। কিন্তু একবারে শেষ কইরা ফালাইছে।’

ডিএমপির ডিসি মির্জা তারেক আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে জুতার ছাপটা ভেতরে কেন, বাইরে কেন জুতার ছাপ নাই। জুতার ছাপটা উনারই, উনার হাজবেন্ডের।’

এর এক সপ্তাহ না যেতেই রাজধানীর কলাবাগানে পারিবারিক কলহের জেরে স্বামীর হাতে স্ত্রী ও শাশুড়ি খুন হন। হত্যাকাণ্ডের পর স্বামী শিপন থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পারিবারিক সহিংসতায় ৩ শতাধিক নারী নিহত হয়েছেন। এ সময়ে আহত হয়েছেন ২ শতাধিক নারী। আত্মহত্যা করেছেন ১৪৭ জন এবং অ্যাসিড সহিংসতার শিকার হয়েছেন আরও চারজন। সব মিলিয়ে প্রথম ছয় মাসে অন্তত ১ হাজার ৬২১টি নারী নির্যাতনের ঘটনা সামনে এসেছে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে এসব ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় নারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এক নারী বলেন, ‘কথা শুনলেই তো ডরাই। স্বামীর কাছে যদি নিরাপত্তাই না থাকে, তাহলে নারীরা কার কাছে নিরাপত্তা পাবে?’

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হলেও শুরুতেই আইনি প্রতিকার চান না। ফলে ছোটখাটো বিরোধ ও নির্যাতন ধীরে ধীরে গুরুতর সহিংসতা এবং শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে রূপ নিতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, ভুক্তভোগীরা অনেক সময় থানায় গিয়ে অভিযোগ বা প্রতিবেদন করেন না। তাঁর মতে, পারিবারিক বিরোধগুলো অভ্যন্তরীণভাবে সমাধানের পাশাপাশি যেসব ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক আইনি প্রতিকার প্রয়োজন, সেগুলোও দ্রুত মোকাবিলা করা জরুরি।

পুলিশের পক্ষ থেকেও পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা ও কাউন্সেলিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মনে করেন, সব ধরনের পারিবারিক বিরোধ শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পারিবারিক সহিংসতা ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধে কমিউনিটি ও বিট পুলিশিং জোরদার করা হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে পুলিশের প্রতিটি ইউনিটকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতার প্রাথমিক পর্যায়েই কার্যকর আইনি ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার ভয়াবহ পরিণতি ঠেকানো সম্ভব। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ এবং কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করাও জরুরি।

শুধু পারিবারিক হত্যা ও সহিংসতা নয়, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নিয়েও জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ।