জাতীয়

নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়নে লটারি, বদলি বাণিজ্য বন্ধে কঠোর গণপূর্ত মন্ত্রী


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম

নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি-পদায়নে লটারি, বদলি বাণিজ্য বন্ধে কঠোর গণপূর্ত মন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন লটারির মাধ্যমে করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। তিনি বলেছেন, বদলি বাণিজ্য বন্ধ, প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং যোগ্য ব্যক্তিকে উপযুক্ত স্থানে পদায়নের লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন কার্যক্রমে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী, অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সাংবাদিকেরা।

মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের জানান, এর আগে গত ৩০ জুলাই ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী, আগস্টে ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী এবং গত ১৬ আগস্ট ২১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ১৯০ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৩০ জন প্রকৌশলীকে এই পদ্ধতিতে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়ায় মানবিক দিক বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী বলেন, কারও বিশেষ প্রয়োজন থাকলে তিনি আবেদন করতে পারবেন। কাউকে হয়রানি করা সরকারের উদ্দেশ্য নয়; বরং সবাই যেন সমান সুযোগ পান এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও মানবিক থাকে, সেটিই নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

গণপূর্ত অধিদপ্তরকে স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কথা উল্লেখ করে জাকারিয়া তাহের বলেন, বদলি বাণিজ্য বন্ধ করা, সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত স্থানে দায়িত্ব দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। বিশেষ করে রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে গণপূর্ত বিভাগের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে চান তারা।

তিনি আরও বলেন, মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় কাজ চলছে। বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তর নিয়ে কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এরপর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কার্যক্রম নিয়ে কাজ করা হবে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার উদ্যোগ

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ল্যান্ড ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি জমি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ শোনা যায়। এসব সমস্যা দূর করতে মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে ল্যান্ড ব্যাংক তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সরকারের কাছে কী পরিমাণ জমি রয়েছে, কোন জমি দখলে আছে এবং কোনগুলো অবৈধ দখলে রয়েছে, তা চিহ্নিত করে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার কাজ চলছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদে যতটা সম্ভব ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল করার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।

আবাসন বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে জাকারিয়া তাহের বলেন, কে আবাসন বরাদ্দ পাচ্ছেন আর কে পাচ্ছেন না, তা নিয়ে আগে নানা প্রশ্ন ছিল। এ প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এ-সংক্রান্ত প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, দখল হয়ে যাওয়া সরকারি জমি উদ্ধারে কাজ চলছে। জমির সঠিক হিসাব তৈরি করে ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হবে। কোন জমি সরকারের মালিকানাধীন, কোনটি সরকারের দখলে রয়েছে এবং কোনটি দখলের বাইরে, সেসব তথ্য যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নতুন সচিবালয় নির্মাণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

সচিবালয় পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরবর্তী অগ্রগতি জানতে চাইলে গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, সচিবালয় নিয়ে পরিকল্পনার কাজ প্রায় চার মাস আগে শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে সচিবালয়ের এক নম্বর ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তবে মন্ত্রিসভায় বিষয়টি আলোচনার সময় সংসদ ভবন ও আগারগাঁও এলাকাকে দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার প্রসঙ্গ উঠে আসে। এরপর বিষয়টি নিয়ে সমীক্ষা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে সেই অনুযায়ী কাজ চলছে।

মন্ত্রী জানান, আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপিত হতে পারে। সেখানে নতুন সচিবালয় নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে দ্রুত কাজ শুরুর জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি নেওয়া রয়েছে। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই প্রকল্পটির কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হবে। মন্ত্রিসভা নতুন সচিবালয় নির্মাণের অনুমোদন দিলে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বর্তমান সচিবালয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে জাকারিয়া তাহের বলেন, সেখানে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। কয়েকটি মন্ত্রণালয় সচিবালয়ের বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং পার্কিংয়ের জায়গাও অপ্রতুল। এ ছাড়া অধিকাংশ ভবন ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত হওয়ায় সেগুলো অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। বর্তমান স্থানে থাকলেও ভবনগুলো নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই নতুন সচিবালয় নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

নতুন সচিবালয়ের সম্ভাব্য আয়তন সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে এখনো ধারণাগত পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া গেলে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নতুন সচিবালয়ের আয়তন প্রায় ৩০ লাখ থেকে ৩২ লাখ বর্গফুট হতে পারে।

লটারির মাধ্যমে পদায়নে কাজের গতি বেড়েছে: প্রতিমন্ত্রী

গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, এর আগে লটারির মাধ্যমে পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা প্রশংসিত হয়েছে। এই পদ্ধতির ফলে মন্ত্রণালয়ের কাজে গতি এসেছে।

আলোচনা শেষে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এবং প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর লটারির বাক্স থেকে চিরকুট তুলে নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়ন কার্যক্রম শুরু করেন। সরকারের প্রত্যাশা, এ পদ্ধতির মাধ্যমে বদলি-পদায়নে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং প্রশাসনিক কাজে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।