রাজনীতি
আসন সমঝোতায় অচলাবস্থা, ভাঙনের মুখে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামি জোট
আসন বণ্টন নিয়ে চরম অচলাবস্থায় পড়ে ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ইসলামি জোট। জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। একাধিক বৈঠক ও ছাড় দেওয়ার পরও কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
জোট সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী নিজেদের জন্য ৪০টি আসনে সমঝোতায় রাজি হলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এতে সন্তুষ্ট নয়। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন দলটির দাবি, দেশজুড়ে তাদের উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাংক রয়েছে, ফলে তারা আরও বেশি আসনের দাবিদার। এমনকি জামায়াত ৪০ আসনের বাইরে কিছু আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দিলেও তাতে তারা সম্মত হয়নি। এ অবস্থানেই অনড় থাকায় জোটের ভাঙনের আশঙ্কা ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠেছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ঘিরেও। দলটি নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির তুলনায় বেশি আসনের দাবি করায় জামায়াতের সঙ্গে তাদের চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো হয়নি। রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-এই দুই দল ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে আলাদাভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।
গত মঙ্গলবার ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে আসন ভাগাভাগি চূড়ান্ত করে যৌথ ঘোষণা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জোটের ভেতরে কোনো সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।
এদিকে, প্রাথমিক সমঝোতার ভিত্তিতে জামায়াতে ইসলামী চরমোনাই পীর ও মামুনুল হকের দলের প্রার্থীদের বিপরীতে এক ডজনেরও বেশি আসনে নিজেদের কোনো প্রার্থী দেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ছাড়ের ফলে ওই দুটি দল জামায়াতের সঙ্গে দরকষাকষিতে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের নেতৃত্বে আট দলীয় ইসলামি জোট আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে আসছিল। তবে জুলাইযোদ্ধাদের সংগঠন এনসিপি, বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং মজিবুর রহমান মনজু ও ব্যারিস্টার ফুয়াদের নেতৃত্বাধীন এবি পার্টি যুক্ত হয়ে ১১ দলীয় জোট গঠনের পর থেকেই ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব বাড়তে শুরু করে।
এনসিপিসহ নতুন তিন দলের সঙ্গে জামায়াতের ঐক্যের পর জোটের ভেতরে ইসলামি দলগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায় বলে তাদের ধারণা। এর ফলে কম আসন পাওয়ার আশঙ্কায় জোটবদ্ধ নির্বাচনের প্রতি তাদের আগ্রহও কমতে থাকে। বিশেষ করে এনসিপি যুক্ত হওয়ায় জামায়াতের ওপর চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা ইসলামি দলগুলোর কমে গেছে বলে তারা মনে করছে।
মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনের আগে ১১ দলীয় জোট সমঝোতার ভিত্তিতে ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলেও বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। দেখা যায়, ৩০০ আসনের বিপরীতে জোটের প্রায় ৬০০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। তখন জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়, সময় স্বল্পতার কারণেই এমনটি হয়েছে এবং আলোচনা করে আসন চূড়ান্ত করা হবে। এরই মধ্যে জামায়াত এনসিপিকে ৩০টি আসন ছেড়ে দেয়, যা এনসিপি আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নিয়েছে।
বর্তমানে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন আট দলীয় ইসলামি জোটে রয়েছে—চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। তবে চলমান অচলাবস্থায় এই জোট টিকে থাকবে নাকি ভেঙে যাবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।