সারাদেশ

মরিয়মের মৃত্যুর দিন কী ঘটেছিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:১৪ পিএম

মরিয়মের মৃত্যুর দিন কী ঘটেছিল, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবি: সংগৃহীত

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর দিন রাজধানীর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে কী ঘটেছিল, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন মঞ্জুর সরদার নামে এক ব্যক্তি। নিজেকে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করা মঞ্জুর সরদারের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পাওয়ার পর জানালা দিয়ে তাকিয়ে মরিয়ম খাতুনকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা। তবে তার মৃত্যু কীভাবে হয়েছে বা এর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার দিনের বিস্তারিত বর্ণনা দেন শ্যামনগরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মঞ্জুর সরদার।

মঞ্জুর সরদার জানান, ২০ সেপ্টেম্বর আদালতে যাওয়ার জন্য গাজী নজরুল ইসলাম তাকে ফোন করে ডেকে নেন। আদালতের কার্যক্রম শেষে বিকেল ৩টার দিকে তারা ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে ফিরে যান। তার সঙ্গে আরও পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যক্তি ছিলেন। ফ্ল্যাটে ফিরে তারা গেস্ট রুমে বসে খাবার খান। অন্যদিকে গাজী নজরুল ইসলাম তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা একটি কক্ষে খাবার খান বলে দাবি করেন মঞ্জুর।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর গাজী নজরুল ইসলাম দ্রুত এসে তাকে ভেতরে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, একটি কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজা খোলার জন্য চেষ্টা করা হলেও তারা সেটি খুলতে পারেননি।

পরে কক্ষটির পেছনের দিকে গিয়ে তারা একটি জানালা খোলা দেখতে পান। জানালার পর্দা সরিয়ে ভেতরে তাকালে মরিয়ম খাতুনকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে দাবি করেন মঞ্জুর। তার ভাষ্য, মরিয়মের গলায় এবং ফ্যানের সঙ্গে কাপড়জাতীয় কিছু প্যাঁচানো ছিল। কক্ষের ভেতরে একটি চেয়ার ও একটি প্লাস্টিকের টুল পড়ে থাকতে দেখেন তারা।

মঞ্জুর আরও জানান, মরিয়ম জীবিত না মৃত-তা নিশ্চিত হওয়ার পর তারা দরজা বা জানালা না ভেঙে পুলিশ ও মরিয়মের পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে সংসদ ভবন এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানানো হয়। তাদের মাধ্যমে শেরেবাংলা নগর থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের সরে যেতে বলে।

তবে প্রত্যক্ষদর্শীর এই বর্ণনা থেকে মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যায় না। এটি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ বা কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল-তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।

এদিকে মরিয়ম খাতুনের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ তার মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ওবায়দুল্লাহকে দায়ী করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ও আমার মেয়েকে ঘর থেকে বাইরে বের করছে, ও সবকিছু করছে।’ তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা যায়নি।

মাসুম বিল্লাহ জানান, বিয়ের পর তার মেয়ে ওই ফ্ল্যাটেই থাকতেন। তবে বিয়ের পর মেয়ের সঙ্গে কোনো ধরনের সমস্যা বা অভিযোগের কথা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, মরিয়ম তার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ করেননি।

মরিয়ম খাতুনের কাছ থেকে পাওয়া কয়েকটি চিঠির বিষয়েও কথা বলেন তার বাবা। তিনি জানান, পুলিশ তাকে চিঠিগুলো দেখিয়েছে। তবে সেগুলো মরিয়মের নিজের হাতে লেখা কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

জানা গেছে, রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তার বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন।

মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং শ্যালক ওবায়দুল্লাহকে আসামি করা হয়েছে। মামলার পর পুলিশ গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে।

এদিকে মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে সোমবার শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে নেতা-কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হন। পরে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়।

মিছিলটি উপজেলার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে স্থানীয় নাগরিক নেতা আসাদুজ্জামান মিটু, আবুল কালাম মড়ল, রেজাউল ইসলাম, আসিসুর রহমান, নূরনগরের আবুল ইউসুফসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সমাবেশে বক্তারা মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা। বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে গাজী নজরুল ইসলামের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনে উপনির্বাচনের দাবিও জানানো হয়।

বিক্ষোভ কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে গাজী নজরুল ইসলামের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।

মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা এবং পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলার পর ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হবে।