রাজধানী
আমার ভাইকে মার্ডার করা হয়েছে: তাহসিফের বোনের ফেসবুকে ক্ষোভ
নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ। মঙ্গলবার রাত থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন। তবে তাহসিফের মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু বা দুর্ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে হত্যার অভিযোগ তুলেছেন তাঁর খালাতো বোন মোশফেকা জাহান।
তাহসিফের মৃত্যুর পর ফেসবুকে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে মোশফেকা জাহান অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও শেয়ার করার কারণেই তাঁর ভাইকে এমন পরিণতির শিকার হতে হয়েছে। পোস্টে তিনি লেখেন, “আমার ভাইকে মার্ডার করা হয়েছে। কী দোষ ছিল তার? হাসিনার পালানোর ভিডিও শেয়ার করা?” তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফ নিজে ওই ভিডিও ধারণ করেননি; একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে কেবল সেটি শেয়ার করেছিলেন। ভিডিওটি তাঁর কোনো সহকর্মী ধারণ করে থাকতে পারেন বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে মোশফেকা জাহান আরও অভিযোগ করেন, তাহসিফকে অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে তাঁকে দিনের পর দিন মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এত কিছুর পরও তাঁকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়া না পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
তাহসিফের খালাতো বোনের দাবি, চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিয়মিত তাঁকে অনুসরণ করতেন বলে তাহসিফ নিজেই তাঁকে জানিয়েছিলেন। তাঁকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন মোশফেকা। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশপ্রেমিক হওয়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে সক্রিয় থাকার কারণেই কি তাহসিফকে এমন চরম পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে? তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্যসংবলিত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় আসে। ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা থাকলেও বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। অন্যদিকে, আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গত বছরের ৪ আগস্ট জানিয়েছিল, কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক অভিযোগ ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়ায় তাহসিফকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল বলে সংস্থাটি জানায়।
নৌপুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেল ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির একটি দল তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় যায়। সেখানে নদে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো পাঞ্জাবি।
পুলিশ জানায়, মরদেহের সঙ্গে থাকা হাতঘড়ি এবং পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরে ওই ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয় এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যেতে পারে।
তাহসিফের মৃত্যুকে ঘিরে তাঁর পরিবারের তোলা হত্যার অভিযোগ এবং ঘটনার পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এটি দুর্ঘটনা, অন্য কোনো কারণে মৃত্যু, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড-তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর পেছনে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো তদন্ত-ফলাফল জানা যায়নি।