সারাবিশ্ব
ভারতকে দুর্বল ভাবার সুযোগ নেই, গোয়েন্দা সক্ষমতা বুঝতে ‘ধুরন্ধর’ দেখার পরামর্শ মন্ত্রীর
চীন-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা ও সংঘাতের পরিস্থিতি নিয়ে এক জ্যেষ্ঠ সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তার বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের মধ্যে ভারতকে ‘খুব শক্তিশালী’ দেশ হিসেবে অভিহিত করেছেন অরুণাচল প্রদেশের মন্ত্রী বালো রাজা। ভারতের গোয়েন্দা সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে দাবি করে তা উপলব্ধি করতে বলিউডের গোয়েন্দা-থ্রিলার সিনেমা ‘ধুরন্ধর’ দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত-চীন সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)-এর প্রধান শত্রুজিৎ সিং কাপুরের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন বালো রাজা। তিনি অরুণাচল প্রদেশের নগরবিষয়ক, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও বেসামরিক বিমান চলাচলবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গত মঙ্গলবার ইটানগরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বালো রাজা প্রশ্ন তোলেন, একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কেন এমন বক্তব্য দেবেন, যাতে ভারতের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে দুর্বলতার ধারণা তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, ভারতের শক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা থাকা জরুরি।
এ প্রসঙ্গে বালো রাজা বলেন, ‘আপনি যখন মহাপরিচালক, তখন এ ধরনের বক্তব্য দেবেন কেন? নিজেকে দুর্বল ভাবছেন কেন? ভারত খুব শক্তিশালী। আপনারা নিশ্চয়ই “ধুরন্ধর” সিনেমাটি দেখেছেন। সিনেমাটি দেখুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন ভারতের গোয়েন্দা সক্ষমতা কতটা বেড়েছে।’ তাঁর এই বক্তব্যে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর মূল্যায়ন এবং ভারতের গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এর আগে অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় চীনা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত থাকার বিষয়ে আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসে। ওই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বালো রাজা ভারতের সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন এবং গোয়েন্দা কার্যক্রমের অগ্রগতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
গত ২২ অক্টোবর রাজস্থানের আলওয়ারে আইটিবিপি সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বাহিনীটির প্রধান শত্রুজিৎ সিং কাপুর। ভারত-চীন সীমান্তের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি তিনি বাহিনীর নবগঠিত ‘শৌর্য’ কমান্ডো দলগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সীমান্তে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব দলের গুরুত্বও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
কাপুর অস্ত্র ও সরঞ্জামের আধুনিকায়নের পাশাপাশি ড্রোন যুদ্ধের মতো পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল দিক ছিল, পরিবর্তিত যুদ্ধপরিস্থিতিতে শুধু প্রচলিত কৌশলের ওপর নির্ভর করে সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যথেষ্ট নয়। এ জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি চীনকে ভারতের ‘সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ’ বলেও উল্লেখ করেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্য সামনে আসার পর ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা সীমান্তের প্রকৃত পরিস্থিতি এবং সেখানে সংঘাতের কারণ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন। সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তবে সীমান্তে সংঘাতের প্রকৃতি ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
এদিকে সীমান্তে উদীয়মান যুদ্ধপ্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং অভিযান পরিচালনার দক্ষতা বাড়াতে আইটিবিপি আধুনিকায়নের কার্যক্রম জোরদার করছে। ড্রোনের ব্যবহারসহ পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনীর প্রস্তুতি বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত থাকার বিষয়ে আইটিবিপি প্রধানের কথিত বক্তব্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চীনা বাহিনী প্রচলিত টহলপদ্ধতি থেকে সরে এলে ভারত-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় মাঝেমধ্যে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘বিস্তারিত বিষয়ে আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেব। আমরা আগেও জানিয়েছি, চীনা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত টহলপদ্ধতি থেকে সরে এলে ভারত-চীন সীমান্তবর্তী এলাকার পরিস্থিতি মাঝেমধ্যে বিঘ্নিত হয়। অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর ভুল-বোঝাবুঝি ও ভুল হিসাব-নিকাশ এড়াতে দুই পক্ষ বিদ্যমান কূটনৈতিক ও সামরিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে যাচ্ছে।’
মুখপাত্র আরও জানান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে উপযুক্ত এলাকাগুলোতে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা সম্পর্কে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর উপায় নিয়েও আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে ভারত ও চীন। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তার বক্তব্য, বিরোধীদের প্রশ্ন এবং অরুণাচল প্রদেশের মন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আধুনিক সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর শান্তি বজায় রাখতে কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলছে নয়াদিল্লি।