জাতীয়
বাংলাদেশ-জাপানের ছয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, দুই প্রকল্পে ২৯৫.৫ মিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারে ছয়টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ২৯৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান জাপান সফরে এসব চুক্তি ও ঋণের প্রতিশ্রুতি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের সরকারি সফরে জাপানে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের বিভিন্ন অর্জন ও দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির বিষয়ে তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাত স্বাধীন।
স্বাক্ষরিত ছয়টি সহযোগিতা দলিলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও গভীর করার পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
চুক্তিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য অনুদান চুক্তি রয়েছে। এ চুক্তির আওতায় সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান, অনুদান দেওয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও উপকূলীয় নজরদারি সক্ষমতা জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে একটি সহযোগিতা স্মারক (এমওসি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা এবং বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কৃষি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিয়েছে দুই দেশ। এ লক্ষ্যে জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও সফরের সহযোগিতা দলিলে গুরুত্ব পেয়েছে। এ বিষয়ে দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মসূচি (এমপ্লয়মেন্ট ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম-ইএসডিপি) নিয়ে একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সহযোগিতা জোরদার করতে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি আগ্রহপত্র (লেটার অব ইনটেন্ট-এলওআই) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর পথ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ১০০ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট পরিবেশ ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে ৩০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ১৯৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান, ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম ও উপজেলা পরিচালন সক্ষমতা বাড়াতে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুটি প্রকল্পে জাপানের ঋণ সহায়তার মোট পরিমাণ ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। এই অর্থায়ন বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চার দিনের সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে জাপান গেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যানসহ উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ছয়টি সহযোগিতা দলিল স্বাক্ষর এবং দুটি উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণের প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়ন হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ, দক্ষতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।