সারাবিশ্ব
ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা, নেতানিয়াহুর সামনে চার সম্ভাব্য পথ
ইসরায়েলের নির্বাচনে ৮৫ শতাংশ ভোট গণনা শেষে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট-কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারছেন না। ফলে দেশটিতে নতুন করে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো একটিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে হতে পারে। আর কোনো সমঝোতা সম্ভব না হলে নতুন নির্বাচনই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি।
বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে নেতানিয়াহুর সামনে সরকার গঠনের চারটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন, আরব দলগুলোর সমর্থনে বিরোধী জোটের সরকার প্রতিষ্ঠা, বিরোধী শিবিরের ডানপন্থী দলগুলোকে নিজেদের পক্ষে টানা এবং সবশেষে নতুন নির্বাচনের পথে হাঁটা। তবে প্রতিটি বিকল্পের ক্ষেত্রেই রয়েছে রাজনৈতিক বাধা ও নানা অনিশ্চয়তা।
জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনে সমঝোতা কি সম্ভব?
প্রথম সম্ভাবনা হলো, বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের দল ইয়াশারের সঙ্গে সমঝোতা করে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করা। তবে এ ধরনের সরকার গঠনের জন্য আইজেনকটকে তাঁর নির্বাচনী অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। নির্বাচনী প্রচারে তিনি নিজেকে নেতানিয়াহুর একমাত্র বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ফলে দুই নেতার মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে না।
আইজেনকট অতীতে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘মিথ্যার সংস্কৃতি’, রাজনৈতিক বিভাজন ও উসকানি ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুও চাইলে তাঁর বর্তমান জোটের কট্টর ডানপন্থী ও অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলোকে বাদ দিয়ে একটি বৃহত্তর ঐক্যের সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন। তবে নির্বাচনের রাতে নেতানিয়াহু তাঁর ‘বিশ্বস্ত অংশীদারদের’ ধন্যবাদ জানিয়ে শক্তিশালী ডানপন্থী সরকার গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এতে বর্তমান জোটসঙ্গীদের বাদ দিয়ে নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে ইরানের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে রাজনৈতিক বিরোধ উপেক্ষা করে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চাপ বাড়তে পারে। নির্বাচনের আগে ইসরায়েলি ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন চাইছিলেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি ঘটলে তা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের চেষ্টা আইজেনকটের
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন নিয়ে আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠন। এমনটি হলে ইসরায়েলের রাজনীতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে। ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো একটি স্বতন্ত্র আরব দল আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের জোট সরকারে যোগ দিয়েছিল। তবে সেই সরকার বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি।
এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলো প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব জনগোষ্ঠীর ভোটের ভিত্তিতে দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, ইউনাইটেড আরব লিস্ট প্রায় সাতটি আসন পেতে পারে। দলটি বিরোধী সরকারকে সমর্থন দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্ট প্রায় ১২টি আসন পেতে পারে এবং তারা সরকারে সরাসরি যোগ না দিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে আইজেনকটকে দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। গাজা পরিস্থিতি ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকায় এ ধরনের জোট কতটা স্থিতিশীল হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
বিরোধী শিবিরের ডানপন্থীদের টানতে পারেন নেতানিয়াহু
তৃতীয় সম্ভাবনা হলো, বিরোধী জোটের ডানপন্থী দলগুলোকে নিজেদের পক্ষে এনে সরকার গঠন করা। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা হলেন নেতানিয়াহুর সাবেক জোটসঙ্গী নাফতালি বেনেট এবং ইসরায়েল বেইতেনু দলের নেতা আভিগদর লিবারম্যান। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার মতো বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের অবস্থানের সঙ্গে নেতানিয়াহুর কিছু মিল থাকলেও রাজনৈতিক সমঝোতার পথে বড় বাধা রয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে বেনেট ও লিবারম্যান-দুজনই নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর অঙ্গীকার করেছেন। ফলে তাঁদের অবস্থান পরিবর্তন করে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া অতি-রক্ষণশীল ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের পক্ষে তাঁদের অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের দুটি অতি-রক্ষণশীল দল এ ধরনের উদ্যোগের বিরোধিতা করে। ফলে সামরিক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য মেটানো ছাড়া এ ধরনের জোট গঠন কঠিন হবে।
সব সমীকরণ ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচন
সরকার গঠনের অন্য কোনো পথ কার্যকর না হলে ইসরায়েলে আবারও নির্বাচন আয়োজন করতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তাঁর সমর্থকদের একাংশ মনে করতে পারেন, নতুন নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁদের অনুকূলে আসতে পারে। তবে পুনরায় ভোট হলে ফলাফল কী হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের যে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা গেছে, পরবর্তী নির্বাচনে তা একই মাত্রায় নাও থাকতে পারে। বিপরীতে, ডানপন্থী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। এ ছাড়া নেতানিয়াহুবিরোধী হিসেবে বিবেচিত বিদেশে বসবাসরত প্রায় ৭০ হাজার ইসরায়েলি নাগরিক এবারের নির্বাচনে ভোট দিতে দেশে ফিরেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচন হলে তাঁদের সবাই আবার দেশে ফিরে ভোট দেবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নির্বাচনী ব্যবস্থায় নির্ধারিত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে না পারা কয়েকটি ডানপন্থী দল পরবর্তী নির্বাচনে কম ভোট পেতে পারে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা না-ও করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ ও তাদের মিত্ররা আসনসংখ্যার হিসাবে সুবিধা পেতে পারে। তবে ভোটারদের অংশগ্রহণ, দলগুলোর কৌশল এবং রাজনৈতিক জোটের পরিবর্তনের ওপর নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে।
ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ নতুন নয়। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নেতানিয়াহু ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সরকার গঠন নিয়ে বিরোধের জেরে দেশটিতে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে ইসরায়েল আবারও একই ধরনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহু জোটের সমীকরণ বদলে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন, নাকি সরকার গঠনে ব্যর্থ হয়ে দেশটিকে আরেকটি নির্বাচনের দিকে ঠেলে দেবেন।