সারাদেশ
কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে সুনামগঞ্জে দুই সেতুর নির্মাণকাজে বাধার অভিযোগ
সুনামগঞ্জে দুটি সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া এবং এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জ-৪ (সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কাজের ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। একই অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল।
ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট এলাকার বাসিন্দা এবং ইসলাম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী। অভিযোগে তিনি সংসদ সদস্য ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি, প্রাণনাশের হুমকি, পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, নানাভাবে হয়রানি এবং সরকারি উন্নয়নকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। এসব অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
জানা গেছে, ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় মুক্তিরখলা-১ সেতু ও সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজ করছেন। প্রায় ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ বিভিন্ন সময়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। সর্বশেষ মঙ্গলবার সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চেয়েছেন।
ঠিকাদারের অভিযোগ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল ও তাঁর অনুসারীরা বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্ন ব্যক্তি ও মাধ্যম ব্যবহার করে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। পাশাপাশি তাঁকে নানাভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেছেন শফিকুল ইসলাম।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত ২০ অক্টোবর মুক্তিরখলা-১ সেতুর নির্মাণকাজে দুই দফায় বাধা দেওয়া হয় এবং কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে ৫ অক্টোবর জেলা যুবদলের এক নেতা তাঁকে ফোন করে হুমকি দেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে ২০ অক্টোবর সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের এক নেতা ফোন করে সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য চাপ দেন বলেও অভিযোগ করেছেন ঠিকাদার।
শফিকুল ইসলামের অভিযোগ, মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার দিন বিকেলে সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম ওই এলাকা দিয়ে ফেরার সময় সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং কাজ বন্ধ রাখতে বলেন। এ সময় সংসদ সদস্যের সঙ্গে থাকা লোকজন কয়েকজন শ্রমিককে মারধর করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত রোলারের চালক মনির, পে-লোডার চালক কবির আহমদ এবং সাইট ঠিকাদার হোসেন আহমদ আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া দুটি মামলায় তাঁকে আসামি করা এবং পুলিশি হয়রানির অভিযোগও তুলেছেন ঠিকাদার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনের সড়কে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একটি মিছিলের ঘটনায় ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলায় তাঁকে ৫১ নম্বর আসামি করা হয়। এ ছাড়া গত বছরের ২৮ মার্চ জামালগঞ্জ থানার বেহেলী ইউনিয়নের করালজান বিল গ্রুপ (খ) জলমহালের অন্তর্গত কাবিলার বিল থেকে মাছ চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাঁকে ১৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি। এ ঘটনায় তাঁর সিলেটের বাসায়ও পুলিশ পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন শফিকুল ইসলাম।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল। তাঁর দাবি, ঠিকাদার শফিকুল ইসলামকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে স্থানীয় লোকজন তাঁকে সালামপুর সেতুর গার্ডওয়াল নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি দেখান। বিষয়টি সরেজমিনে দেখতে বুধবার নির্বাহী প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাওয়ার কথা ছিল বলে জানান তিনি।
সংসদ সদস্য বলেন, সেতুর কাজ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা চাঁদা দাবির অভিযোগ ভিত্তিহীন। কেউ তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করলে তা প্রমাণ করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, এলাকার মানুষের অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন; কাউকে চাঁদা দাবি করা তো দূরের কথা, ধমকও দেননি।
বুধবার দুপুরে আবারও সালামপুর সেতু পরিদর্শন করেন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম। এ সময় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, মঙ্গলবার একটি খেলা থেকে ফেরার পথে এলাকাবাসীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সেতুর কাজ দেখেন। স্থানীয় বাসিন্দারা কাজের অনিয়ম ও ধীরগতির কারণে ভোগান্তিতে রয়েছেন বলে তাঁকে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। কাজের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আড়াল করতেই এসব করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঠিকাদারকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য বলেন, কোনো মামলা হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী কাজ করবে। কাউকে হয়রানি করার সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
এ সময় উপস্থিত সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, নির্মাণকাজে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, প্রকল্পের কাজে ধীরগতি রয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
দুটি সেতুর নির্মাণকাজে বাধা, চাঁদা দাবির অভিযোগ এবং কাজের মান নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ঠিকাদারের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং নির্মাণকাজের স্বাভাবিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই এবং তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।