সারাবিশ্ব

ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর রেকর্ড সাফল্য, তবু ক্ষমতার সমীকরণে কেন পিছিয়ে?


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম

ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর রেকর্ড সাফল্য, তবু ক্ষমতার সমীকরণে কেন পিছিয়ে?
ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো রেকর্ডসংখ্যক আসন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করলেও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এখনো বড় বাধার মুখে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারায় সরকার গঠনের সমীকরণে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ইসরায়েলের প্রধান ইহুদি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর একাংশের আপত্তির কারণে নির্বাচনী সাফল্যকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তর করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবারের নির্বাচনের আংশিক ফলাফল ও বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম—এই দুই দল মিলিয়ে ১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্টে ১৭টি আসন পেতে পারে। একই হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৪টি এবং আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৯টি আসন পেতে পারে। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে দুই পক্ষকেই বাড়তি সমর্থনের প্রয়োজন হতে পারে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ জোট ৫৩টি আসন পেতে পারে। আর আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসনসংখ্যা হতে পারে ৪৮। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসাবের মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল চিত্র একই—কোনো পক্ষের জন্যই এককভাবে সরকার গঠন করা সহজ হবে না। এ পরিস্থিতিতে আরব দলগুলোর অবস্থান সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শেকের মতে, এবারের নির্বাচনে আরব ভোটের পুনরুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরব জনগোষ্ঠীকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দেশটির আরব নাগরিকদের ভোট ও প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব বাড়লেও সেই সমর্থনকে সরকার গঠনের কার্যকর অংশীদারত্বে রূপান্তর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলোর সামনে প্রধান বাধা শুধু আসনসংখ্যার হিসাব নয়; বরং ইহুদি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশের আদর্শিক আপত্তি। অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাভিত্তিক ফিলিস্তিন স্টাডিজবিষয়ক প্রতিষ্ঠান প্যালেস্টিনিয়ান ফোরাম ফর ইসরায়েলি স্টাডিজের মহাপরিচালক হোনাইদা ঘানামের মতে, আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে সরকার গঠনের বৈধ অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ইসরায়েলের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অনীহা রয়েছে। এ কারণে আরব দলগুলোর আসনসংখ্যা বাড়লেও সরকার গঠনে তাদের প্রভাব প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণে আরব দলগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

টাইমস অব ইসরায়েল-এর হিসাব অনুযায়ী, আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সঙ্গে আরব দলগুলো যুক্ত হলে সম্মিলিত আসনসংখ্যা ৬৬-তে পৌঁছাতে পারে। ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সীমা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে এই সমর্থন বিরোধী জোটকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, সংখ্যার হিসাবে আরব দলগুলোর সমর্থন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের পথ খুলে দিতে পারে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার এই হিসাব বাস্তবে কার্যকর করা সহজ নয়। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজ্জারের মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্নে বিরোধী শিবিরের অনীহার পেছনে আদর্শিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আইজেনকট আরব দলগুলোর প্রতি আনুগত্যের শর্ত আরোপ করেছেন এবং তাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আসনসংখ্যার হিসাবে সম্ভাবনা তৈরি হলেও রাজনৈতিক সমঝোতা এখনো অনিশ্চিত।

এ পরিস্থিতিতে রা’আম দলের নেতা মানসুর আব্বাস সরকারে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে তিনি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসংক্রান্ত দায়িত্বে আরব দলকে যুক্ত করার শর্ত দিয়েছেন। অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিনও নেতানিয়াহুর ডানপন্থী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার কথা বলেছেন। তাঁদের অবস্থান থেকে বোঝা যায়, আরব দলগুলো শুধু পার্লামেন্টে আসন বাড়ানো নয়, বরং নীতিনির্ধারণ ও সরকার পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগও চাইছে।

সমঝোতার পথে বাধা কোথায়?

আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সমঝোতা নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। নেতানিয়াহু আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইসরায়েল বেইতেনু দলের নেতা আভিগদর লিবারম্যান সরকারে কেবল জায়নবাদী দলগুলোকে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ ধরনের অবস্থান আরব দলগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।

তবে বিরোধী শিবিরের সব নেতা একই অবস্থানে নেই। বিরোধী জোটের অংশ ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, ইহুদি ও আরব ভোটারদের মধ্যে বিভাজন বজায় রাখার রাজনৈতিক নীতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। এই অবস্থান বিরোধী শিবিরের মধ্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে মতপার্থক্যের বিষয়টিও সামনে এনেছে।

২০২১ সালের নজির কি এবারও কাজে আসবে?

ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের নজির রয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর রা’আম দলের সমর্থন নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সে সময় আরব নেতৃত্বাধীন একটি দল সরকার গঠনের সমীকরণে কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। তবে ওই সরকার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ফলে অতীতের এই নজির বর্তমান পরিস্থিতিতে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এবারও একই ধরনের সমঝোতা হবে-এমন নিশ্চয়তা নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা সম্ভব না হলে ইসরায়েলের রাজনীতিতে কয়েকটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন করে নির্বাচন আয়োজন, আরব দলগুলোর বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন, বিরোধী জোটের কোনো দলের নেতানিয়াহুর শিবিরে যোগ দেওয়া কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চেষ্টা। কোন পরিস্থিতি বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা, আদর্শিক অবস্থান ও ক্ষমতার হিসাবের ওপর।

সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্ভাব্য রেকর্ডসংখ্যক আসন দেশটির রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। কিন্তু পার্লামেন্টে আসন পাওয়া আর সরকার গঠনে নির্ধারক ভূমিকা রাখা এক বিষয় নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের গাণিতিক সুযোগ থাকলেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা ও আদর্শিক বিরোধের কারণে আরব দলগুলো শেষ পর্যন্ত ‘কিংমেকার’ হয়ে উঠতে পারবে কি না, সেটিই এখন ইসরায়েলের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।