পরিবেশ-জলবায়ু
জিম্বাবুয়ে ফিরিয়ে নিচ্ছে না সেই দুই চিতাবাঘ, দেশে বসেই পুনর্বাসনের উদ্যোগ বাংলাদেশের
দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে গাজীপুরের সাফারি পার্কে ছোট ও সীমিত পরিসরের একটি বেষ্টনীতে বন্দিজীবন কাটাচ্ছে জিম্বাবুয়ে থেকে পাচার হয়ে বাংলাদেশে আসা দুটি চিতাবাঘ। ২০১৮ সালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে খাঁচাবন্দী অবস্থায় উদ্ধারের পর থেকে প্রাণী দুটির জীবন কাটছে সাফারি পার্কের তুলনামূলক অস্বাস্থ্যকর ও সংকীর্ণ পরিবেশে। তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত জিম্বাবুয়ে সরকার প্রাণী দুটিকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে বাংলাদেশেই তাদের জন্য স্থায়ী ও উন্নত আবাসনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছে বন অধিদপ্তর।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালের ১৫ জুন। ওই দিন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে খাঁচাবন্দী অবস্থায় দুটি চিতাশাবক উদ্ধার করা হয়। পরবর্তী সময়ে বন্য প্রাণী পাচার প্রতিরোধে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গ্রেপ্তার হওয়া পাচারকারীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বন বিভাগ নিশ্চিত হয়, চিতাশাবক দুটি আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়ে থেকে পাচার করে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল।
উদ্ধারের পর প্রাণী দুটিকে সাময়িকভাবে গাজীপুর সাফারি পার্কের বন্য প্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সেই সাময়িক অবস্থানই দীর্ঘমেয়াদি বন্দিজীবনে পরিণত হয়। প্রায় আট বছর ধরে পার্কের ছোট একটি প্রকোষ্ঠেই থাকতে হচ্ছে চিতাগুলোকে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাফারি পার্কের বিদ্যমান নকশাগত সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে এতদিন তাদের জন্য বড় ও উপযুক্ত বেষ্টনী তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
চিতাবাঘ দুটির দুরবস্থা দূর করতে একপর্যায়ে এগিয়ে আসে জিম্বাবুয়ের বন্য প্রাণী পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অ্যান আই ফর দ্য ওয়াইল্ড’। সংগঠনটি চিতাবাঘ দুটিকে জিম্বাবুয়েতে ফিরিয়ে নিয়ে উপযুক্ত পরিবেশে পুনর্বাসনের আগ্রহ প্রকাশ করে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির জন্য তারা অর্থ সংগ্রহ করতেও সক্ষম হয়েছে।
এই উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশও সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করে। বাংলাদেশ বন বিভাগের প্রধান সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল জিম্বাবুয়ের ন্যাশনাল পার্কস অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ ম্যানেজমেন্ট অথরিটির মহাপরিচালকের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠান। সেখানে চিতাবাঘ দুটিকে জিম্বাবুয়েতে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ‘অ্যান আই ফর দ্য ওয়াইল্ড’ প্রাণী দুটির সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত বলেও জানানো হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জিম্বাবুয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরবর্তী সময়েও দফায় দফায় যোগাযোগ করা হয়। জিম্বাবুয়ের কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুনে চিতাবাঘ দুটির ভেটেরিনারি সনদসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্রও পাঠায় বন অধিদপ্তর। এতে প্রাণী দুটিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হয়েছিল।
তবে সব প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানোর পরও শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট দেওয়া এক ফিরতি চিঠিতে জিম্বাবুয়ের ন্যাশনাল পার্কস অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে থাকা চিতাবাঘ দুটিকে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রাণী দুটির নিজ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
এদিকে ‘অ্যান আই ফর দ্য ওয়াইল্ড’ জানিয়েছে, তারা জিম্বাবুয়ের বন্য প্রাণী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রায় দেড় বছর ধরে যোগাযোগ করে আসছে। চিতাবাঘ দুটিকে ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় খাঁচা ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরির মতো পর্যাপ্ত অর্থও তারা সংগ্রহ করেছে। এরপরও সরকারি পর্যায় থেকে অনুমতি না পাওয়ায় সংগঠনটি হতাশ। তবে প্রাণী দুটির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
জিম্বাবুয়ে সরকারের কাছ থেকে চিতাবাঘ দুটিকে গ্রহণে অস্বীকৃতি আসার পর এখন বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বাংলাদেশেই তাদের জন্য স্থায়ী আবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন অধিদপ্তর জানিয়েছে, গাজীপুর সাফারি পার্কে চিতাবাঘ দুটির জন্য আগের তুলনায় অনেক বড় ও পর্যাপ্ত জায়গাসম্পন্ন একটি বেষ্টনী নির্মাণ করা হবে।
সাফারি পার্কের দায়িত্বে থাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে চিতাবাঘ দুটির জন্য নতুন বেষ্টনী নির্মাণে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নতুন বেষ্টনী তৈরি হলে দীর্ঘদিন ধরে সংকীর্ণ জায়গায় থাকা প্রাণী দুটি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ও উপযুক্ত পরিবেশ পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রায় আট বছর আগে পাচারের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা এই দুটি চিতাবাঘের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরা না হলেও তাদের জীবনযাপনের পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন নতুন বেষ্টনী নির্মাণের কাজ কত দ্রুত শেষ হয় এবং প্রাণী দুটির জন্য কতটা উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, সেটিই দেখার বিষয়।