পরিবেশ-জলবায়ু

সামনে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, আছে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কাও


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম

সামনে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, আছে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কাও
ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন শীত মৌসুমে দেশে চার থেকে ছয়টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে একাধিক শৈত্যপ্রবাহ তীব্র আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী তিন মাসে বঙ্গোপসাগরে দুই থেকে চারটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে এক থেকে দুটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

শুক্রবার ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের এক প্রতিবেদনে আবহাওয়া অধিদপ্তরের নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে দেশে এক থেকে দুটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, রংপুর এবং খুলনা বিভাগের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসতে পারে।

তবে জানুয়ারি মাসে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। এ সময় এক থেকে দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তখন তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, সাধারণত ডিসেম্বর মাসে এক থেকে দুটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ হতে পারে। জানুয়ারিতে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের পাশাপাশি কখনো কখনো এক বা দুটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, আগামী তিন মাসে শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় এবং নদ-নদীর অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। দেশের অন্যান্য এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঘন কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে আসতে পারে। এতে শীতের অনুভূতি আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

তবে এবার তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা, স্থায়িত্ব ও বিস্তৃতি তুলনামূলক কম থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এল নিনো সক্রিয় থাকায় এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। এ কারণে এবার সামগ্রিকভাবে উষ্ণ শীতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে শৈত্যপ্রবাহ দেখা দিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এল নিনোর সক্রিয়তার কারণে শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা ও স্থায়িত্ব নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সামগ্রিকভাবে এবার তুলনামূলক উষ্ণ শীতকাল পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

শীতের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী তিন মাসে বঙ্গোপসাগরে দুই থেকে চারটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে এক থেকে দুটি লঘুচাপ শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।

এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, অক্টোবর ও নভেম্বর মাস বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ সময় হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর এ সময়ে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো এসব লঘুচাপ শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।

তিনি বলেন, এ সময় সূর্যের দক্ষিণায়নের কারণে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে থাকে এবং রাতের দৈর্ঘ্য বাড়ে। বঙ্গোপসাগর এলাকায় সূর্যের আলোর প্রাপ্যতা বেশি থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।

এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও প্রতিবছর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় না বলে জানান তিনি। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এ ধরনের ঘটনাকে ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা বলা হয়।

বৃষ্টিপাতের বিষয়ে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী তিন মাসে দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে নভেম্বরে চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৩৫ থেকে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বরিশাল বিভাগে ৩০ থেকে ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে।

এ ছাড়া ঢাকা, সিলেট ও খুলনা বিভাগে ১৫ থেকে ২৫ মিলিমিটার, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার এবং রংপুর বিভাগে ৪ থেকে ৮ মিলিমিটার বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।

ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে বৃষ্টিপাত আরও কমতে পারে। ডিসেম্বরে ঢাকা বিভাগে ৮ থেকে ১০ মিলিমিটার এবং সিলেট বিভাগে ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হতে পারে। জানুয়ারিতে খুলনা বিভাগে ১০ থেকে ১৪ মিলিমিটার এবং ঢাকা বিভাগসহ অন্যান্য এলাকায় ৬ থেকে ১০ মিলিমিটার বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিভিন্ন আবহাওয়াগত উপাত্ত, ঊর্ধ্বাকাশের আবহাওয়ার বিন্যাস, জলবায়ু মডেল এবং বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অনুমোদিত আন্তর্জাতিক কেন্দ্রগুলোর পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি এ পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি এল নিনো ও লা নিনা পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ১৯৪৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এ সময়ে গড়ে এক থেকে তিনটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে কোনো কোনোটি শক্তি সঞ্চয় করে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। দীর্ঘ সময়ের এসব তথ্যের গড় চিত্র বিশ্লেষণ করেই দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

তবে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে অনিশ্চয়তার মাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে বলে জানিয়েছেন এই আবহাওয়াবিদ। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসের পাশাপাশি প্রতিদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসও গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৬ থেকে ৮ ডিগ্রির মধ্যে থাকলে মাঝারি এবং ৪ থেকে ৬ ডিগ্রির মধ্যে নামলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়।