জাতীয়
কপ৩১ সম্মেলনে ঋণ নয়, অনুদানভিত্তিক জলবায়ু সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কপ৩১ সম্মেলনে পর্যাপ্ত ও কার্যকর অনুদানভিত্তিক সহায়তা চাইবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে জলবায়ু অভিযোজন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় ঋণের পরিবর্তে অনুদান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বৃহস্পতিবার (তারিখ উল্লেখযোগ্য) সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলন কপ৩১-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি, প্রধান অগ্রাধিকার ও প্রত্যাশা তুলে ধরতে এ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকবে পর্যাপ্ত, সহজলভ্য ও অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা। বিশেষ করে অভিযোজন কার্যক্রম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানানো হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার আবেদন, অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ।
তিনি জানান, তুরস্ক সরকারের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ, দেশের জাতীয় অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বনেতাদের সামনে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশ ক্রমাগত নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, খরা ও তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন, জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সুরক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করাই হবে বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার।
অভিযোজন কার্যক্রমের বিষয়ে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং বৈশ্বিক অভিযোজন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তা চাইবে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, হাওর, চরাঞ্চল ও খরাপ্রবণ এলাকার মানুষের পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে অভিযোজন কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত এবং সহজ প্রক্রিয়ায় অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি, কর্মসংস্থান ও জীবিকা হারানোসহ বিভিন্ন অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায়ও নতুন ও অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার প্রচেষ্টার বিষয়ে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমাতে হবে। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং বিশ্বের প্রধান নির্গমনকারী দেশগুলোকে তাদের দায়িত্ব ও সক্ষমতা অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শর্তসাপেক্ষ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানাবে বাংলাদেশ।
মন্ত্রী আরও বলেন, কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও জ্বালানি খাতে পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে। তবে এ রূপান্তরের ব্যয় ও সুফলের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং নারী ও তরুণদের জন্য শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে।
তিনি জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন, পরিচ্ছন্ন শিল্প ও পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তির সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের আলোচ্য অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকবে। এ ছাড়া বন, ম্যানগ্রোভ, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, প্রকৃতিনির্ভর সমাধান এবং নারী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে পরিচালিত জলবায়ু উদ্যোগে অর্থায়ন বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেবে বাংলাদেশ।
জলবায়ু মোকাবিলায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের প্রভাব নিয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নেওয়া বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সহযোগিতা চাওয়া হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও বিভিন্ন সংস্থার মতামত এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে কপ৩১ সম্মেলনের জন্য বাংলাদেশের অবস্থানপত্র তৈরি করা হয়েছে। সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোট (এলডিসি), জি-৭৭ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল।
তিনি আরও বলেন, কপ৩১ সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের প্রত্যাশা হলো জলবায়ু অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সহায়তার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি অর্জন। এসব সহায়তা যেন কেবল প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষায় বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।
সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও নিজস্ব অবস্থান তুলে ধরতে বিশেষ আয়োজনের কথাও জানান ড. সাইমুম পারভেজ। তিনি বলেন, সম্মেলনস্থলে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে ১০০ বর্গমিটার আয়তনের একটি প্যাভিলিয়ন স্থাপন করা হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি, অভিযোজন অভিজ্ঞতা, এনডিসি ৩.০, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, জলবায়ু অর্থায়ন, জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি, কার্বন বাজার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হবে।
এ প্যাভিলিয়নকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়, নীতিনির্ধারণী আলোচনা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরতে পৃথক জুট প্যাভিলিয়নও স্থাপন করা হবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম, অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান, বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলামসহ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।