সারাবিশ্ব

ইউক্রেনের শান্তি আলোচনায় গুরুত্ব হারানোর শঙ্কা ইউরোপের: মেলোনি


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩৪ পিএম

ইউক্রেনের শান্তি আলোচনায় গুরুত্ব হারানোর শঙ্কা ইউরোপের: মেলোনি
ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে চলমান শান্তি আলোচনায় ইউরোপের প্রভাব ও গুরুত্ব ক্রমেই কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। তাঁর মতে, ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয়ের অভাব এবং পৃথক পৃথক উদ্যোগের কারণে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ইউরোপের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পক্ষ থেকে একজন একক প্রতিনিধি নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ওই প্রতিনিধিকে সুস্পষ্ট দায়িত্ব ও কার্যকর আলোচনার ক্ষমতা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী।

বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তাকে পাঠানো এক চিঠিতে মেলোনি এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

চিঠিতে মেলোনি উল্লেখ করেন, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিভিন্ন দেশ ও পক্ষের উদ্যোগে একাধিক আলোচনার কাঠামো তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় ইউরোপের সম্মিলিত অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন একটি ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, ইউরোপের কোনো সুসংগঠিত কূটনৈতিক পরিকল্পনা নেই। এভাবে চলতে থাকলে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেকোনো শান্তি আলোচনায় ইউরোপ কার্যত গুরুত্ব হারাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তি আলোচনার কাঠামো বা পদ্ধতির চেয়ে আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই ফলাফলে কার্যকর প্রভাব রাখতে হলে ইউরোপকে একটি অভিন্ন ও সুস্পষ্ট অবস্থান থেকে কথা বলতে হবে। এ জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কে প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং তাঁর আলোচনার ক্ষমতা ও দায়িত্বের পরিধি কতটুকু হবে, তা দ্রুত নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

মেলোনি আরও স্পষ্ট করেন, তিনি নিজে কিংবা ইতালির জন্য আলোচনার টেবিলে বিশেষ কোনো আসন দাবি করছেন না। বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও নির্ধারিত দায়িত্বের ভিত্তিতে একজন প্রতিনিধিকে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে তিনি। তাঁর মতে, ইইউর অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিনিধি সদস্যদেশগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার নিয়ে আলোচনা করলে রোম তা গ্রহণ করবে না।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে নানা ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা আলাদাভাবে বৈঠক করছেন। আবার ইউরোপীয় নেতাদের কেউ কেউ রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন। পাশাপাশি ইউক্রেনের পুনর্গঠন, যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলো ও ন্যাটোর মধ্যে পৃথক আলোচনা চলছে। মেলোনির মতে, এসব উদ্যোগের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় না থাকায় ইউরোপের কূটনৈতিক অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠছে।

চিঠিতে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইউরোপের মধ্যে এ ধরনের সমন্বয়হীনতা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি এমন পক্ষগুলোর স্বার্থ রক্ষা করছে, যারা যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে চায়। ইউক্রেনের মানুষের জীবন এবং ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সরাসরি এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ইউরোপের এমন দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন অবস্থান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নতুন করে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির পর এই প্রথমবারের মতো তিন দেশের প্রতিনিধিরা একসঙ্গে আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বৈঠককে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর আগে বুধবার ইউক্রেনের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে কারিগরি পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ন্যাটো ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ ছাড়া যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয়েও ন্যাটোর উদ্যোগে বৃহস্পতিবার পৃথক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মেলোনি চান, আগামী সপ্তাহে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে অনুষ্ঠেয় ইউরোপীয় কাউন্সিলের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপের প্রতিনিধিত্ব ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হোক। এরপর যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও অন্যান্য ইউরোপীয় অংশীদারের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী ডিসেম্বরের সম্মেলনে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।

উল্লেখ্য, ইউক্রেনকে অন্যতম বৃহৎ আর্থিক ও সামরিক সহায়তা প্রদানকারী পক্ষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত শান্তি আলোচনায় জোটটির আনুষ্ঠানিক ভূমিকা এখনও সীমিত। ফলে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ, ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইউরোপের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। মেলোনির সাম্প্রতিক চিঠিতে সেই উদ্বেগের পাশাপাশি ইউরোপের জন্য একটি অভিন্ন কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।