জাতীয়
শিশু অধিকার নিশ্চিতে দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে: ডেপুটি স্পিকার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবগঠিত ‘শিশু অধিকারবিষয়ক সংসদীয় ককাস’-এর প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক পরিচয়, শ্রেণি-পেশা কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়।
ককাসের সভাপতি শিরীন সুলতানা এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ককাসের পৃষ্ঠপোষক ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপি। এ সময় ককাসের সদস্য মোরশেদ মিলটন এমপি, এ কে এম ফজলুল হক মিলন এমপি, শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এমপি, আন্না মিন্জ এমপি এবং মাধবী মার্মা এমপি উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ককাসের সভাপতি শিরীন সুলতানা। বক্তব্যে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী ও মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত ছাত্র-জনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে শিশু অধিকার সুরক্ষা, শিশুবান্ধব আইন ও নীতি প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকরণসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংসদীয় উদ্যোগ আরও জোরদার করা, উন্নয়ন সহযোগী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করা, নীতিনির্ধারণী আলোচনা এবং কার্যক্রমের তদারকি বাড়ানোর বিষয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংসদীয় ককাসের এ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সংসদ সদস্যদের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; বরং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও অধিকারভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, দেশে শিশু অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য অনেক আইন রয়েছে। তবে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং সেসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আইন, বাজেট এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, শিশু অধিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সরকারের প্রচার-প্রচারণা জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মরত ব্যক্তিদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে শিশু সুরক্ষায় তাঁদের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ, দলমত, শ্রেণি-পেশা কিংবা সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়। প্রতিটি শিশুর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংসদ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান ডেপুটি স্পিকার।
ককাসের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। শিশু অধিকার-সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবিত আইন ও খসড়া আইন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কায়সার কামাল বলেন, প্রয়োজনে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা যেতে পারে। নির্বাহী বিভাগের কোনো পর্যায়ে প্রতিবন্ধকতা থাকলে সংসদ সদস্যরা বেসরকারি বিলের মাধ্যমেও সংশ্লিষ্ট বিষয় সংসদে তুলে ধরতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সংসদের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
ডেপুটি স্পিকার নির্বাহী বিভাগকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ককাসের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানান। বাংলাদেশে শিশু অধিকারবিষয়ক সংসদীয় ককাসের উদ্যোগকে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিত টিম হিসেবে কাজ করার পরামর্শ দেন। পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ককাসের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এ সময় ককাসের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জাতীয় সংসদের অধিবেশন প্রত্যক্ষ করার আমন্ত্রণও জানান ডেপুটি স্পিকার।
বৈঠকে শিশু অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশু, পাহাড়ি অঞ্চলের শিশু, অসহায়, এতিম ও দুস্থ শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। এসব শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়।
এ ছাড়া শিশুদের সুরক্ষায় কেবল আইনি ব্যবস্থা গ্রহণই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তাদের মধ্যে নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসন সম্পর্কে যথাযথ শিক্ষা প্রদানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও আলোচনা করা হয়। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ককাসের সভাপতি শিরীন সুলতানা এমপি বলেন, বর্তমান সরকার জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এসব কার্যক্রমের সুফল যেন দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের সার্বিক সুরক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও অংশীজনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ও প্রতিনিধিরা, ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ ছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।