সারাবিশ্ব

যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও মিয়ানমারে ফিরছে?


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৪ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও মিয়ানমারে ফিরছে?
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্দরমহলে এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও মিয়ানমারের দিকে ফিরছে? নাকি ওয়াশিংটন কখনোই পুরোপুরি মিয়ানমার থেকে সরে যায়নি? ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের সামরিক সরকারের মধ্যে সম্পর্ক ছিল গভীর অবিশ্বাস, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে একের পর এক ঘটনা যেন সেই সম্পর্কের সমীকরণে নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। জুনে আটক হওয়া মার্কিন নাগরিক ও মিয়ানমারে American Chamber of Commerce-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট Adam Castillo প্রায় তিন মাস আটক থাকার পর ১৬ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার থেকে বহিষ্কৃত হন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দুই দেশের “বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের” বিবেচনায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারাও তার মুক্তিতে ভূমিকা রাখার কথা জানিয়েছেন। Castillo-কে একটি ব্যবসায়িক বিরোধ ও কথিত ‘breach of trust’ অভিযোগে আটক করা হয়েছিল; অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি ও তার সমর্থকেরা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন।

এরপর আসে আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। TIME-এর সাংবাদিক Charlie Campbell ২৮ আগস্ট নেইপিদোতে গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎকার নেন মিয়ানমারের সামরিক নেতা Min Aung Hlaing-এর। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর পশ্চিমা গণমাধ্যমের সঙ্গে তার এমন সরাসরি সাক্ষাৎকার বিরল ঘটনা। সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি, পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ যোগাযোগের বিষয় উঠে আসে। TIME-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মিন অং হ্লাইং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে এই সাক্ষাৎকার নিয়েও পরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকার TIME-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনকে সমালোচনা করে দাবি করেছে, সাক্ষাৎকারের বক্তব্যকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এবং প্রতিবেদনে সাংবাদিকের নিজস্ব ব্যাখ্যা ও অন্যান্য সূত্রের মন্তব্য যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, সাক্ষাৎকারটি শুধু কূটনৈতিক বার্তার কারণে নয়, এর উপস্থাপনাকে ঘিরেও আলোচনায় এসেছে।

এর পাশাপাশি ওয়াশিংটনে লবিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথও তৈরি করেছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। মার্কিন বিদেশি এজেন্ট নিবন্ধনসংক্রান্ত নথির বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয় DCI Group-এর সঙ্গে প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলারের বার্ষিক চুক্তি করেছে। এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগী Roger Stone, যিনি প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার ডলার পাওয়ার কথা নথিতে উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির লক্ষ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, বাণিজ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানবিক সহযোগিতার বিষয় উঠে এসেছে।

এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শুধু গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভূরাজনীতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, বাণিজ্যপথ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব।

মিয়ানমারের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। দেশটির পশ্চিমে ভারত, উত্তরে ও পূর্বে চীন, দক্ষিণ-পূর্বে থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর। ফলে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সংযোগের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। চীনও দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামরিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক জোরদার করে আসছে। এই বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের জন্য মিয়ানমারকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা কৌশলগতভাবে সহজ নয়।

মিয়ানমারের প্রাকৃতিক সম্পদও এখানে বড় একটি বিষয়। দেশটিতে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস, মূল্যবান খনিজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। বিশেষ করে বিরল খনিজ ও কৌশলগত কাঁচামালের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় চীনের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের সম্পদের গুরুত্ব বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে ফেলেছে। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাব্য প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মিয়ানমারের সামরিক শাসনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ইতিহাসও জটিল। শীতল যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কমিউনিজম মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশল নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মিয়ানমারের সামরিক শাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতির কারণে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ১৯৮৮ সালের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে দমন-পীড়নের পর পশ্চিমা চাপ আরও বাড়ে। আবার ২০১১-১২ সালের রাজনৈতিক সংস্কার ও বেসামরিক সরকারের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় বারাক ওবামা প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র-মিয়ানমার সম্পর্কেও নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল।

কিন্তু ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির সামরিক অভ্যুত্থান সেই সম্পর্ককে আবারও গভীর সংকটে ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। একই সময়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে।

তারপরও ২০২৬ সালের ঘটনাগুলো একটি নতুন বাস্তবতা সামনে আনছে। একদিকে নিষেধাজ্ঞা এখনো রয়েছে, অন্যদিকে যোগাযোগের দরজাও পুরোপুরি বন্ধ নেই। মার্কিন নাগরিক Adam Castillo-এর মুক্তি ও বহিষ্কারের ঘটনায় দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ হয়েছে। আবার Min Aung Hlaing-এর সঙ্গে TIME-এর সাক্ষাৎকার এবং ওয়াশিংটনে মিয়ানমারের লবিং প্রচেষ্টাও দেখাচ্ছে যে নেইপিদো পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ খুঁজছে।

এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-মিয়ানমারের সামরিক সরকার এখন নিজেকে শুধু সামরিক প্রশাসন হিসেবে নয়, একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। জানুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে মিন অং হ্লাইংয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবির্ভাবকে বিরোধী পক্ষ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। TIME-ও তার এই রূপান্তরকে সামরিক নেতা থেকে বেসামরিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে।

অন্যদিকে মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন নয়; অর্থনীতি, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং পশ্চিমা বিনিয়োগের সম্ভাবনাও এর সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক যোগাযোগ মিয়ানমারের সামরিক সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে এখানেই বড় প্রশ্ন-যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে যাচ্ছে? বর্তমান তথ্য থেকে এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কাঠামো এখনো বহাল রয়েছে এবং মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থান পুরোপুরি বদলে গেছে-এমন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই।

বরং বর্তমান পরিস্থিতিকে দুই ধরনের কূটনৈতিক বাস্তবতার সমান্তরাল উপস্থিতি হিসেবে দেখা যায়। একদিকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নিষেধাজ্ঞার নীতি; অন্যদিকে চীনের প্রভাব, প্রাকৃতিক সম্পদ, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা।

আর এই জায়গাতেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সম্ভাব্য লেনদেনভিত্তিক কূটনীতির সঙ্গে মিয়ানমারের আগ্রহের একটি সম্ভাব্য মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। মিয়ানমার পশ্চিমাদের কাছে বাণিজ্য, প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবিক সহযোগিতা ও চীনের প্রভাবের বাইরে নতুন যোগাযোগের সুযোগের কথা তুলে ধরছে। আর ওয়াশিংটনের জন্য মিয়ানমার এমন একটি ভূখণ্ড, যাকে পুরোপুরি চীনের প্রভাববলয়ের বাইরে রাখার কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে।

তাই প্রশ্নটি হয়তো শুধু “যুক্তরাষ্ট্র কি মিয়ানমারে ফিরছে?”-এমন সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। বরং আসল প্রশ্ন হতে পারে, ওয়াশিংটন কি মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে নতুন কোনো সীমিত ও স্বার্থভিত্তিক যোগাযোগের পথ তৈরি করতে চাইছে?

বর্তমান ঘটনাগুলো অন্তত এটুকু দেখাচ্ছে-নেইপিদো ওয়াশিংটনের দরজা খোলার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা করছে। আর যুক্তরাষ্ট্রও সব যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। তবে এই যোগাযোগ ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক পুনর্বাসন, সীমিত সহযোগিতা, নাকি শুধুই কৌশলগত দরকষাকষিতে পরিণত হবে-তার উত্তর এখনো সময়ের অপেক্ষায়।

একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট-মিয়ানমারকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক সরকারের আন্তর্জাতিক বৈধতার চেষ্টা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি-এই তিনটি বিষয় আগামী দিনে একে অপরের সঙ্গে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যেতে পারে।