সারাবিশ্ব

বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা রাখাইনে ভয়াবহ বিমান হামলা, নিহত ৫০


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৬ পিএম

বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা রাখাইনে ভয়াবহ বিমান হামলা, নিহত ৫০
ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ বিমান হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং আরও ৫৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি বলছে, রাখাইনে চলমান সহিংসতা আবারও প্রমাণ করছে যে মিয়ানমারে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসইভাবে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফান দুজারিক মঙ্গলবার নিউইয়র্কে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেন, রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার ধারাবাহিকতা সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। কিয়াউকতাও এলাকায় সর্বশেষ এই বিমান হামলা সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে মিয়ানমারের সব পক্ষকে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও জানিয়েছে জাতিসংঘ।

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকতাও টাউনশিপে একটি ব্যস্ত বাজারের কাছে এই বিমান হামলা চালানো হয়। অঞ্চলটি বর্তমানে জান্তাবিরোধী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আরাকান আর্মির দাবি, হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সহায়তাকর্মীরাও হতাহতের এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর বলছে, হামলার সময় বাজারটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে দুই শতাধিক দোকান ছিল। এসব দোকানে রাখাইন, রোহিঙ্গা, হিন্দু, দাইনেটসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ব্যবসা করতেন।

হামলার পর ঘটনাস্থলের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে আগুন, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা এবং হতাহতদের দেখা গেছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক বলেছেন, এই হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। তিনি যুদ্ধরত সব পক্ষকে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইং থু খা অভিযোগ করেছেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে জনবহুল বাজার, স্কুল, আবাসিক এলাকা ও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকিও দিয়েছে সংগঠনটি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অতীতে দাবি করেছে যে তারা বেসামরিক হতাহতের ঘটনা এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে এবং তাদের হামলার লক্ষ্য থাকে সামরিক স্থাপনা বা সশস্ত্র প্রতিপক্ষ।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারজুড়ে ব্যাপক সংঘাত চলছে। সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অন্যান্য বিরোধী শক্তি লড়াই করছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে মিয়ানমারে ৩৫ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং নিহতের সংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছেছে।

রাখাইনের এই হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মিয়ানমারে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, রাখাইনের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধানও মিয়ানমারে চলমান সহিংসতার মধ্যে কাউকে জোরপূর্বক ফেরত না পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে, একই সময়ে মালয়েশিয়া প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে দেশটিতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মিয়ানমারের সঙ্গে করা একটি প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার আওতায় এটি প্রথম ধাপ। মালয়েশিয়া সরকার প্রক্রিয়াটিকে স্বেচ্ছামূলক হিসেবে উল্লেখ করলেও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ বলছে, চলমান সংঘাত ও মানবাধিকার পরিস্থিতির কারণে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

রাখাইনে সর্বশেষ এই বিমান হামলা শুধু নতুন করে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেনি, বরং মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের মানবিক পরিস্থিতিও আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে নিরাপদ, টেকসই ও বাধাহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সব পক্ষকে সহিংসতা বন্ধ করে বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।