সারাবিশ্ব

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নতুন বার্তা, ইসলামী বিশ্বের সংকট নিয়ে এরদোয়ানের সতর্কতা


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৪ এএম

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নতুন বার্তা, ইসলামী বিশ্বের সংকট নিয়ে এরদোয়ানের সতর্কতা
ছবি: সংগৃহীত

ইসলামী বিশ্ব বর্তমানে গুরুতর সংকট ও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তিনি বলেছেন, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু তিন দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার উদ্যোগ নয়; এর মাধ্যমে ইসলামী বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়ারও চেষ্টা করা হচ্ছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চুক্তিকে ঘিরে ইতোমধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে এবং এই উদ্যোগ সফল হবে। তুরস্কের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ সামসুনে তরুণদের নিয়ে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে এরদোয়ান বলেন, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক একসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইসলামী বিশ্বের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ বার্তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, উদ্যোগটি নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে এবং তিন দেশ এ ক্ষেত্রে সফল হবে বলে তিনি আশাবাদী।

‘বিশ্ব শুধু পাঁচ দেশের জন্য নয়’

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন এরদোয়ান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য-যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে ইঙ্গিত করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ‘বিশ্ব এই পাঁচটি দেশের চেয়েও বড়।’

এই বক্তব্যের প্রসঙ্গে তুর্কি প্রেসিডেন্ট আবারও একটি আরও ন্যায়সংগত ও প্রতিনিধিত্বশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বিশ্বের অনেক দেশ ও জনগোষ্ঠীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নেই। এ কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার আনা জরুরি।

এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক আরও ন্যায়সংগত একটি বিশ্ব প্রতিষ্ঠার পক্ষে তার অবস্থান অব্যাহত রাখবে। বিশেষ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে যে সমালোচনা করে আসছেন, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কারের আহ্বান জানান।

হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এরদোয়ান। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে চলমান পরিস্থিতি তুরস্ক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানান তিনি।

এরদোয়ান বলেন, হরমুজ প্রণালিতে কী ঘটছে, তা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। একই সঙ্গে উপসাগরের আরও বেশ কিছু এলাকায় গুরুতর সংকট তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তার ভাষায়, ইসলামী বিশ্বের সামনে যেসব সমস্যা ও সংকট তৈরি হয়েছে, সেগুলোর দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। এসব সংকট মোকাবিলায় তুরস্ক অতীতেও এই অঞ্চলের পাশে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

‘তুরস্কের প্রতি প্রত্যাশা অনেক বেশি’

আঞ্চলিক সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মধ্যেও তুরস্ককে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ রাখার বিষয়ে নিজের সরকারের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, আশপাশের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা চললেও তুরস্ককে এসব ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছে তার সরকার।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, বিষয়টিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তুরস্কের প্রতি শুধু দেশের জনগণের নয়, আশপাশের অঞ্চলের মানুষেরও প্রত্যাশা অনেক বেশি।

তিনি আরও বলেন, পুরো অঞ্চল যখন কঠিন সময় পার করছে, তখন তুরস্ককে সংঘাতের সরাসরি প্রভাব থেকে দূরে রাখা এবং একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অস্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিস্থিতির মধ্যেও তুরস্ক বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ন্যাটো সম্মেলনে তুরস্কের তৈরি অস্ত্র উপহার

এ সময় চলতি বছরের জুলাইয়ে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন এরদোয়ান। তিনি জানান, সম্মেলনে অংশ নিতে তুরস্ক সফর করা বিভিন্ন দেশের নেতাদের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান মেকানিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন-এমকেই (MKE) উৎপাদিত অস্ত্র উপহার দেওয়া হয়েছিল।

এরদোয়ান বলেন, বিদেশি নেতাদের তুরস্কের নিজস্বভাবে উৎপাদিত প্রতিরক্ষা পণ্য উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এসব উপহার পেয়ে সফররত নেতারাও সন্তুষ্ট হয়েছেন বলে জানান তিনি।

এর মাধ্যমে তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা এবং দেশটির তৈরি সামরিক সরঞ্জামের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

কপ-৩১ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও অনুষ্ঠানে কথা বলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, ভূমধ্যসাগরীয় পর্যটন শহর আনতালিয়ায় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলন কপ-৩১ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

এরদোয়ান বলেন, ইনশা আল্লাহ, আনতালিয়ায় কপ-৩১ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলন সফলভাবে আয়োজনের জন্য তুরস্ক জাতিসংঘ এবং মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

তিনি আরও জানান, সম্মেলনকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে তুরস্কের।

‘জিরো ওয়েস্ট’ উদ্যোগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

তুরস্কের পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন এরদোয়ান। বিশেষ করে তার স্ত্রী ও ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ানের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘জিরো ওয়েস্ট’ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

এরদোয়ানের দাবি, বর্জ্য কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার বাড়ানো এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে পরিচালিত এই উদ্যোগ জাতিসংঘ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি পেয়েছে।

তুর্কি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে একদিকে যেমন ইসলামী বিশ্বের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সহযোগিতার বিষয়টি উঠে এসেছে, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংস্কার, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং জলবায়ু কূটনীতির বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। সব মিলিয়ে তার বক্তব্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে তুরস্কের ভূমিকা আরও সক্রিয় করার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।