ক্যাম্পাস

ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর: আবু তৈয়বের সঙ্গে ছিলেন চবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৭ এএম

ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি ভাঙচুর: আবু তৈয়বের সঙ্গে ছিলেন চবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনের সংগ্রহশালায় রাখা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, ছবির ফ্রেম ভাঙচুর ও ছবি ছিঁড়ে ফেলার সময় ডাকসুর সাবেক শিক্ষার্থী ও ভিপি প্রার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদারের সঙ্গে ছিলেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক সাবেক নেতা। ওই ব্যক্তির নাম আব্দুল্লাহ আল মামুন।

সোমবার (১৪ আগস্ট) দুপুরে ডাকসুর সংগ্রহশালায় প্রবেশ করে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর একটি ছবির ফ্রেম ভাঙচুর করেন আবু তৈয়ব হাবিলদার। একই সময়ে ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের একটি ছবিও ভাঙচুর করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের বরাতে জানা গেছে, এ সময় আবু তৈয়বের সঙ্গে আব্দুল্লাহ আল মামুনও উপস্থিত ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আব্দুল্লাহ আল মামুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের টিপু-সুজন কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সিএফসি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ও সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছেন।

জিন্নাহর ছবি ভাঙচুরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে পোস্টও দেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। ওই পোস্টে তিনি নিজেকে ঘটনাটির ‘সরাসরি যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আরেকটি পোস্টে তিনি দাবি করেন, ডাকসুর সংগ্রহশালায় ‘চিহ্নিত রাজাকার’ জিন্নাহর ছবি টাঙানো হয়েছিল এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেটি ভেঙে ফেলেছেন।

তবে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবিটি কেন রাখা হয়েছিল, সেটি নিয়ে ডাকসু কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যাও রয়েছে। সংগ্রহশালার ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন’ অংশে ছবিটি যুক্ত করা হয়েছিল ১৯৪৮ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে। ছবিটিতে দেখা যায়, তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বক্তব্য দিচ্ছেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ওই বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির বিরোধিতা করেছিলেন।

ডাকসুর সংগ্রহশালায় ছবিটি যুক্ত হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের একটি অংশের দাবি ছিল, ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জিন্নাহর এমন ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় রাখা উচিত নয়। অন্যদিকে ডাকসু কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বোঝাতেই সংশ্লিষ্ট ছবিটি প্রদর্শন করা হয়েছিল।

সোমবার দুপুরে সংগ্রহশালায় প্রবেশ করে প্রথমে জিন্নাহর ছবিটি সরিয়ে নেন আবু তৈয়ব হাবিলদার। পরে ছবিটির ফ্রেম ভাঙচুর এবং ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের উত্থাপিত ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ছবিও ভাঙচুর করা হয়। ওই ছবিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পাশে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

ছবি ভাঙচুরের আগে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূত্রপাতের সঙ্গে জিন্নাহর ভূমিকা রয়েছে এবং ভাষার প্রশ্নে তার অবস্থানই পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রেক্ষাপট তৈরি করে।

আবু তৈয়ব বলেন, জিন্নাহ তৎকালীন কার্জন হলে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে ঘোষণা করেছিলেন। তার এই অবস্থানের প্রতিবাদ করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ হরতাল পালিত হয়। ওই আন্দোলনে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হন বলেও তিনি দাবি করেন।

আবু তৈয়বের বক্তব্য, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক অবস্থানে থাকা জিন্নাহর ছবি ডাকসুর সংগ্রহশালায় স্থান পাওয়া উচিত নয়। এ কারণেই তিনি ছবিটি সরিয়ে ভাঙচুর করেছেন বলে জানান।

অন্যদিকে ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ এক সংবাদ সম্মেলনে ছবিটি সংগ্রহশালায় রাখার কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এর আগে ভাষা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন আন্দোলন ও ঘটনা ঘটেছিল।

এস এম ফরহাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জিন্নাহ বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষার দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের পটভূমি বোঝাতে সেই বক্তব্যকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে সংগ্রহশালায় তুলে ধরা হয়েছিল। ছবির নিচে ইংরেজিতে জিন্নাহর বক্তব্যের উদ্ধৃতিও দেওয়া ছিল বলে জানান তিনি।

ডাকসু কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ছবিটি কোনোভাবেই জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করার উদ্দেশ্যে প্রদর্শন করা হয়নি; বরং ভাষা আন্দোলনের পেছনের ধারাবাহিক ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো তুলে ধরার অংশ হিসেবেই সেটি রাখা হয়েছিল।

এদিকে আবু তৈয়ব হাবিলদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। সাম্প্রতিক ডাকসু নির্বাচনে তিনি আলোচিত ও বয়োজ্যেষ্ঠ ভিপি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনে তিনি মোট ১০টি ভোট পান।

জিন্নাহর ছবি ও লাহোর প্রস্তাবের ছবি ভাঙচুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাকসুর সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ছবি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য, ইতিহাস উপস্থাপনের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ভাঙচুরের সময় আবু তৈয়ব হাবিলদারের সঙ্গে আব্দুল্লাহ আল মামুনের উপস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পোস্ট দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।