সারাবিশ্ব
মদিনায় ১১ কোটি টন ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ আকরিকের সন্ধান
মদিনা অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ আকরিক ও বিরল মৃত্তিকা খনিজের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে সৌদি আরব। দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান জানিয়েছেন, মদিনার জাবাল সাইদ এলাকায় অনুসন্ধান ও ভূতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে প্রায় ১১০ মিলিয়ন টন বা ১১ কোটি টন আকরিক সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাধারণ সম্মেলনের ৭০তম নিয়মিত অধিবেশনে এ তথ্য তুলে ধরেন সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবিষ্কৃত খনিজ সম্পদের মধ্যে উচ্চ ঘনত্বের বিরল মৃত্তিকা উপাদান রয়েছে। বিশেষ করে ভারী বিরল মৃত্তিকা খনিজের পাশাপাশি সেখানে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ইউরেনিয়ামের উপস্থিতিও শনাক্ত হয়েছে।
সৌদি আরবের জন্য এই আবিষ্কারকে কেবল একটি নতুন খনিজ সম্পদের সন্ধান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের খনিজ সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। জাবাল সাইদ এলাকায় ইউরেনিয়াম ও বিরল মৃত্তিকা খনিজের একই সঙ্গে উপস্থিতি সেই পরিকল্পনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার পরই নতুন আবিষ্কার
মদিনায় এই বিপুল খনিজ সম্পদের সন্ধানের খবর এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে।
গত ২২ জুলাই মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট ও সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়।
মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব চুক্তি কয়েক দশকব্যাপী কয়েক বিলিয়ন ডলারের অংশীদারত্বের জন্য একটি আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে। এর ফলে সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
এর পরপরই মদিনায় ইউরেনিয়াম ও বিরল মৃত্তিকা খনিজের বড় মজুতের সন্ধানের খবর সামনে আসায় বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
জাবাল সাইদে কী পরিমাণ খনিজ রয়েছে?
সৌদি জ্বালানিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মদিনার জাবাল সাইদ প্রকল্প এলাকায় পরিচালিত অনুসন্ধান ও ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রায় ১১০ মিলিয়ন টন আকরিক সম্পদের সন্ধান মিলেছে।
এই আকরিকের মধ্যে উচ্চ ঘনত্বের বিরল মৃত্তিকা খনিজ রয়েছে। বিশেষ করে ভারী বিরল মৃত্তিকা উপাদানের পাশাপাশি ইউরেনিয়ামের উপস্থিতিও আশাব্যঞ্জক বলে জানিয়েছেন সৌদি কর্মকর্তারা।
বিরল মৃত্তিকা খনিজ আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামরিক সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিকস এবং উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসব খনিজের বড় মজুত সৌদি আরবকে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খলে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
ভারী ও হালকা বিরল মৃত্তিকা খনিজের বড় মজুত
সৌদি আরবের শিল্প ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় খনি কোম্পানি মা'আদেনের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জাবাল সাইদ প্রকল্প এলাকায় ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়ামের মতো ভারী বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুত প্রায় ৫ লাখ ৫২ হাজার টন। এ ছাড়া নিওডিমিয়াম ও প্রেসিওডিমিয়ামের মতো হালকা বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুত প্রায় ৩ লাখ ৫৫ হাজার টন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডিসপ্রোসিয়াম ও টারবিয়ামসহ ভারী বিরল মৃত্তিকা উপাদান উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, শক্তিশালী চুম্বক, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে নিওডিমিয়াম ও প্রেসিওডিমিয়ামও আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
প্রায় ৩১ হাজার টন ইউরেনিয়ামের মজুত
সিএসআইএসের একই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাবাল সাইদ এলাকায় প্রায় ৩১ হাজার টন ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ-১১০ মিলিয়ন টন বা ১১ কোটি টন হলো মোট আকরিক সম্পদের পরিমাণ; এর পুরোটা ইউরেনিয়াম নয়। ওই বিপুল আকরিকের মধ্যে বিভিন্ন বিরল মৃত্তিকা খনিজের পাশাপাশি ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে।
এই ইউরেনিয়াম সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দেশটি যদি নিজস্বভাবে ইউরেনিয়াম উত্তোলন, প্রক্রিয়াকরণ ও জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারে, তাহলে পারমাণবিক জ্বালানির ক্ষেত্রে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সৌদি আরবের পারমাণবিক জ্বালানি চক্র গড়ার পরিকল্পনা
সৌদি আরব বহুদিন ধরেই বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি খাত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। দেশটির লক্ষ্য শুধু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক জ্বালানি চক্র গড়ে তোলার বিষয়েও দেশটি আগ্রহ দেখিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের অভ্যন্তরে ইউরেনিয়ামের বড় মজুতের সন্ধান সৌদি আরবের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিজস্ব ইউরেনিয়াম সম্পদ থাকলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক জ্বালানি উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে দেশটির সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব হলে এসব খনিজ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও সরবরাহ করা যেতে পারে। ফলে ইউরেনিয়াম ও বিরল মৃত্তিকা খনিজ-দুই ক্ষেত্রেই সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়তে পারে।
মোহাম্মদ বিন সালমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর গতি
সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের পর গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে দুই দেশের সহযোগিতায় নতুন গতি আসে।
ওই সফরের পর অতিপ্রয়োজনীয় খনিজ, ধাতু ও ইউরেনিয়াম খাতে একটি কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলা হয়। এর অংশ হিসেবে সৌদি আরবে বিরল মৃত্তিকা ধাতু প্রক্রিয়াকরণের জন্য নতুন একটি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৪৯ শতাংশ অর্থায়নে সম্মত হয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। অন্যদিকে প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রণকারী ৫১ শতাংশ শেয়ার থাকবে সৌদি রাষ্ট্রীয় খনি কোম্পানি মা'আদেনের হাতে।
মা'আদেনের অংশীদার মার্কিন প্রতিষ্ঠান এমপি ম্যাটেরিয়ালস বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বিরল মৃত্তিকা খনি ও প্রক্রিয়াকরণ কারখানা পরিচালনা করছে। ফলে সৌদি-মার্কিন এই অংশীদারত্বকে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার একটি বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিরল মৃত্তিকা অঞ্চলে জাবাল সাইদ
মদিনা অঞ্চলে অবস্থিত জাবাল সাইদ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ অঞ্চলগুলোর একটি। এলাকাটি জেদ্দা শহর থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত।
সৌদি আরব ইতোমধ্যেই দেশটির বিশাল খনিজ সম্পদকে অর্থনীতির নতুন ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শিল্প, খনিজ, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে বৈচিত্র্য আনার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই খনিজ সম্পদের অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হচ্ছে।
সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খনিজ মজুতের দিক থেকে জাবাল সাইদ প্রকল্প এলাকা বৈশ্বিকভাবে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে সৌদির বিরল খনিজ সম্পদের মূল্য
সৌদি প্রেস এজেন্সির পৃথক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে শনাক্ত হওয়া বিরল মৃত্তিকা উপাদানগুলোর আনুমানিক আর্থিক মূল্য প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
এই মূল্য ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত ইলেকট্রনিকস ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিরল মৃত্তিকা খনিজের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। ফলে সৌদি আরবের এসব সম্পদ ভবিষ্যতে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
আরও ৬৪ কোটি ৪০ লাখ টন খনিজ সম্পদের সন্ধান
শুধু জাবাল সাইদ নয়, সৌদি ভূতাত্ত্বিক জরিপের গবেষণায় আরও দুটি এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে উন্নত পর্যায়ের অনুসন্ধান চলছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ওই দুটি এলাকায় সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬৪৪ মিলিয়ন টন বা ৬৪ কোটি ৪০ লাখ টন খনিজ সম্পদ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব এলাকায় আরও অনুসন্ধান ও মূল্যায়ন সম্পন্ন হলে সৌদি আরবের মোট খনিজ সম্পদের পরিমাণ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সব মিলিয়ে মদিনার জাবাল সাইদ এলাকায় ইউরেনিয়াম ও বিপুল পরিমাণ বিরল মৃত্তিকা খনিজের সন্ধান সৌদি আরবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে এটি দেশটির খনিজভিত্তিক অর্থনীতি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি ও নিজস্ব পারমাণবিক জ্বালানি চক্র গড়ে তোলার পরিকল্পনাকেও নতুন মাত্রা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক পারমাণবিক ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সহযোগিতার পাশাপাশি এই নতুন সম্পদের সন্ধান মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও খনিজ ভূরাজনীতিতেও সৌদি আরবের গুরুত্ব আরও বাড়াতে পারে।