সারাদেশ
চুয়াডাঙ্গায় জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপের উদ্বোধনে সাংবাদিকদের বাধা, আয়োজন ঘিরে ক্ষোভ
একটি খেলার মাঠ। উৎসবের রঙ। অথচ সেই উৎসবের প্রথম দিনেই বিশৃঙ্খলতা ও অব্যবস্থাপনার কারনে ম্লান হয়ে গেছে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। যাদের কলম আর ক্যামেরায় প্রতিদিন উঠে আসে জনগণের কথা, প্রশাসনের স্বচ্ছতার হিসাব, সেই গণমাধ্যমকর্মীরাই প্রশাসনের কাছে হয়েছিল অনাহুত অতিথি, নিজেদের শহরে, নিজেদের চোখের সামনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে যখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপি'র উপস্থিতিতে জেলার কর্মকর্তাদের নিয়ে আলোচনা সভা শুরু হয়, তখন এক অস্বস্তিকর দৃশ্যের জন্ম হয় । যেসব মানুষ প্রতিটি সরকারি অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়ে থাকেন কলমে ও ক্যামেরায়, তাদেরই বসার জায়গা রাখা হয়নি। অপমানিত, উপেক্ষিত গণমাধ্যম কর্মীরা নীরবে প্রতিবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠান বয়কট করে বেরিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ভুল বুঝতে পেরে জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার নিজে গিয়ে অনুরোধ করে তাদের ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু ততক্ষণে যা হারিয়ে গেছে, তা কি আর ফিরে আসে ? বিশ্বাসের একটা চিড় থেকেই যায়।
এদিন বিকাল সাড়ে ৩টায় চুয়াডাঙ্গা রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন পুরাতন স্টেডিয়াম মাঠে যখন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়, তখনও থামেনি অবহেলার ধারা। আমন্ত্রণ পেয়ে ছুঁটে আসা সংবাদকর্মীগণ সেখানেও পড়েন বিশৃঙ্খলা আর অবজ্ঞার মুখে। অভিযোগ ওঠে সংবাদকর্মীগণের সংবাদ তৈরির জন্য ভিডিও ধারণ করার কারণেই নাকি প্রধান অতিথি ও আমন্ত্রিতরা অনুষ্ঠান ও খেলা দেখতে পারছিলেন না। এমন যুক্তিতে মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীগণদের পুলিশ দিয়ে বাধ্য করা হয় মিডিয়া কাভারেজ বন্ধ করে দিতে। ভাবা যায় ! যাদের কাজই হলো ঘটনার সাক্ষী রাখা, তাদেরকেই সাক্ষী হতে না দেয়ার এই নির্মম বাস্তবতা !
কিন্তু একই মাঠে, একই আয়োজনে তথাকথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ভীড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের কার্যক্রমে কোনো বাঁধা আসেনি, প্রশাসনের নজরদারিও চোখে পড়েনি। জানা গেছে, টুর্নামেন্টের প্রস্তুতিমূলক সভাতে এক রাজনৈতিক নেতার চাওয়ার প্রতিফলন ঘটানোর জন্যই কোন সরকারি বৈধতা নেই এমন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আগাম চাহিদা দেয়া হয়েছিল অনুষ্ঠান কাভার করার জন্য। তাহলে প্রশ্ন উঠেই যায় দায়িত্বশীল বৈধ সাংবাদিকতার চেয়ে কি প্রশাসনের কাছে গুরুত্ব পেল অবৈধ কন্টেন্ট ক্রিয়েটরা ?
এ বিষয়ে উক্ত অনুষ্ঠান নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বি.এম. তারিক-উজ-জামানের সঙ্গে তাৎক্ষণিক অভিযোগ করা হলে তিনি তখন মন্ত্রীর প্রটোকল নিয়ে ব্যস্ততার কথা বলেন এবং মন্ত্রী চলে গেলে বিষয়টি দেখবেন বলে জানান। কিন্তু পরবর্তীতে এ বিষয়ে আর কোন প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আর কথা বলেননি।
এই ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছেন চুয়াডাঙ্গার গণমাধ্যম কর্মীগণ। বছরের পর বছর ধরে যারা এই জেলার খবর তুলে ধরেছেন নিরপেক্ষভাবে, সেগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন সারা পৃথিবীতে, আজ তাদেরই যেন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। একটি টুর্নামেন্টের উদ্বোধন হতে পারতো আনন্দ আর ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু পক্ষপাতিত্ব আর অবহেলার ছায়ায় তা পরিণত হলো গণমাধ্যম ও প্রশাসনের সম্পর্কে অবিশ্বাসের অধ্যায়ে।
প্রশ্ন থেকে যায় যে প্রশাসন জনগণের সেবক হওয়ার কথা, সেই প্রশাসনই যখন তথ্যের প্রহরীদের অবজ্ঞা করে, তখন স্বচ্ছতার ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা আশাবাদী হওয়া যায় ?
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টকে ঘিরে নানান বিশৃঙ্খলা আর অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, টুর্নামেন্টের প্রস্তুতিমূলক সভায় সাংবাদিকদের বসার জন্য মিডিয়া গ্যালারী রাখার জন্য বলা হলে আমরা সেটা করেছি। কিন্তু সাংবাদিকরা সেখানে না বসে ক্যামেরা ও স্ট্যান্ড নিয়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করছিল যে আমরা কোন কিছুই দেখতে পারছিলামনা। সে কারনেই তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রীর উপস্হিতিতে উপেক্ষিত সাংবাদিকগণ বসার জায়গা না পেয়ে অনুষ্ঠান বয়কট করে চলে আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই সময়ই সেটার সমাধান হয়ে গিয়েছিল। এত বড় একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করার মত জনবল না থাকার কারনে সব কাজ সুচারুভাবে করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৩ এপ্রিল। শুরু থেকেই তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে রুষ্ট আচরণ ও তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে আসছেন। অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সভা ও অনুষ্ঠানে সাংবাদিকগণ সংবাদ তৈরির জন্য যায়না। এতে সরকারের ভাল কর্মকাণ্ডের সংবাদগুলো প্রচার হচ্ছেনা। এছাড়া কোন সভায় তিনি নিজেই কথা বলে যান,কারর মতামত তিনি গ্রহণ করেননা। তিনি ছাত্র জীবনে কোন দল করতেন এগুলো তিনি ছড়ানোর জন্য তার পক্ষের তোষামোদকারীদের বলে থাকেন। যা অত্যান্ত দৃষ্টিকুটু। অবিলম্বে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা গ্রহণ না করলে এ জেলায় তিনি বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি তলানিতে নিয়ে যাবে বলে ভুক্তভোগীরা মত প্রকাশ করেছেন।