আইন আদালত

আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হরতাল-ধর্মঘট অবৈধ ঘোষণা হাইকোর্টের


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হরতাল-ধর্মঘট অবৈধ ঘোষণা হাইকোর্টের
ছবি: সংগৃহীত

আদালতের কোনো রায় বা আদেশের প্রতিবাদে হরতাল, ধর্মঘট কিংবা কর্মবিরতি আহ্বানকে অবৈধ ও সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে পরিবহন ধর্মঘট কিংবা হরতাল ডাকা হলে সংশ্লিষ্ট বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনের বিরুদ্ধে আইনগত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি শশাঙ্ক কুমার সরকার ও বিচারপতি ফয়সল হাসান আরিফের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের সব নির্বাহী ও বিচারিক কর্তৃপক্ষের জন্য সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আদেশ পালন করা বাধ্যতামূলক। কোনো রায় বা আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আপিল করতে কিংবা প্রচলিত আইনে অন্যান্য প্রতিকার চাইতে পারেন। তবে আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল, ধর্মঘট কিংবা কর্মবিরতি আহ্বানের কোনো আইনগত সুযোগ নেই।

হাইকোর্ট আরও বলেন, কোনো বিচারিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এ ধরনের কর্মসূচি শুধু বিচার বিভাগের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন নয়, বরং তা সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। আদালতের রায় নিয়ে আপত্তি থাকলে আইনানুগ পদ্ধতিতে তা মোকাবিলা করতে হবে। রাস্তায় ধর্মঘট বা হরতাল ডেকে বিচারিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা যাবে না।

রায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হরতাল কিংবা ধর্মঘট আহ্বান করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়েছে।

২০১১ সালের আগস্টে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ, সাংবাদিক ও সম্প্রচারক মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত বাসচালককে সাজা দেন।

বাসচালকের সাজাকে কেন্দ্র করে ওই সময় বাস মালিকরা পরিবহন ধর্মঘট ও হরতাল আহ্বান করেন। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে জনস্বার্থে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়।

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ১ মার্চ হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ রুল জারি করেন। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্মঘট ও হরতাল প্রত্যাহার এবং সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে আদালতের নির্দেশের পরদিন পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।

পরবর্তীতে ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয় বিচারপতি শশাঙ্ক কুমার সরকার ও বিচারপতি ফয়সল হাসানের বেঞ্চে। দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত রুলটি যথাযথ ঘোষণা করেন এবং আদালতের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হরতাল, ধর্মঘট ও কর্মবিরতি আহ্বানকে অবৈধ ও সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করে রায় দেন।

রিটকারী সংগঠনের পক্ষে শুনানিতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের রায় ও নির্দেশনা পালন করা সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক। দুর্ঘটনার ঘটনায় বাসচালকের সাজা হওয়ার পর পরিবহন মালিকরা ধর্মঘট ডেকে আদালতের আদেশের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, সংবিধান নাগরিকের চলাচলের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ দুর্ভোগের শিকার হন। কোনো রায় বা আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের আপিলসহ আইনগত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে রায়ের বিরুদ্ধে হরতাল, ধর্মঘট বা কর্মবিরতি ডাকার কোনো আইনগত অধিকার নেই।

মামলায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, বিভিন্ন রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক এবং সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিসহ মোট ১৭ জনকে বিবাদী করা হয়েছিল।