সারাবিশ্ব
বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে নতুন পোশাক আইন, মুসলিমদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ
ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশটির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে এই আইন কার্যকরের বিষয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তার ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের অধীনে থাকা সব রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের এই উদ্যোগে বিশেষ করে দেশটির বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত আইন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভারতে বর্তমানে ফৌজদারি আইন সবার জন্য অভিন্ন হলেও বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তকসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিষয়ে ধর্ম ও সম্প্রদায়ভেদে আলাদা নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো অনেকাংশে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতি, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই বহুমাত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে সব নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি আইন প্রণয়ন বিজেপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
রোববার এক বক্তব্যে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেন, ‘আমরা কয়েকটি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করেছি এবং আমি আশাবাদী, ২০২৯ সালের মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট শাসিত ২১টি রাজ্যের সবকটিতেই এটি কার্যকর করা সম্ভব হবে।’ তার এই বক্তব্যের পর দেশটির বিভিন্ন মহলে ইউসিসি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এরই মধ্যে ভারতের অন্তত চারটি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে বিজেপি ও এনডিএ-শাসিত অন্যান্য রাজ্যেও এই আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের যুক্তি হলো, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিগত আইনের পরিবর্তে একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু হলে দেশের সব নাগরিকের জন্য পারিবারিক ও দেওয়ানি বিষয়ে একই ধরনের আইনি কাঠামো নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে। মুসলিমদের ধর্মীয় ও পারিবারিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু বিষয় বর্তমানে নিজস্ব ব্যক্তিগত আইনের আওতায় পরিচালিত হয়। ফলে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে এসব ধর্মীয় রীতি ও বিধানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি অভিন্ন আইন চাপিয়ে দিলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে ইউসিসির সমর্থকরা এর পক্ষে ভিন্ন যুক্তি তুলে ধরছেন। তাদের দাবি, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে নারী-পুরুষের আইনি অধিকার আরও সমান হবে এবং ব্যক্তিগত আইনের ক্ষেত্রে বৈষম্য কমবে। বিশেষ করে মুসলিম নারীদের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সমর্থকরা।
সমর্থকদের অন্যতম যুক্তি হলো, নতুন আইন বহুবিবাহের মতো প্রথা বন্ধ করার পাশাপাশি সম্পত্তির ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। একই সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে আদালতনির্ভর একটি অভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া চালু হলে নারীরা আরও বেশি আইনি সুরক্ষা পাবেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, নারী অধিকার ও আইনি সমতার কথা বললেও ইউসিসি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে নতুন আইনের সংঘাত তৈরি হলে তা সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত মূলত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও দেশটিতে বিপুলসংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। প্রায় ২২ কোটি মুসলিম নিয়ে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। জনসংখ্যার বিচারে দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠী বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম সম্প্রদায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
ফলে বিজেপি সরকারের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা শুধু একটি আইনি সংস্কারের বিষয় নয়, বরং ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার, নারী অধিকার এবং দেশের বহুত্ববাদী সামাজিক কাঠামো নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছে। ২০২৯ সালের মধ্যে বিজেপি-এনডিএ শাসিত ২১টি রাজ্যে এই আইন কার্যকর করার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে ভারতের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত আইন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই