সারাবিশ্ব
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার আঁচ বিশ্ববাজারে, ব্রেন্ট তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সম্ভাব্য জ্বালানি সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। সোমবার বিশ্ববাজারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তেলের দাম দ্রুত বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বর সরবরাহের জন্য নির্ধারিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সোমবার ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ দশমিক ৫৪ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের অক্টোবর সরবরাহের দামও ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৩৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই-উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দামই আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে এসেছে। গত সপ্তাহে শুরু হওয়া তেলের দাম বৃদ্ধির প্রবণতাও এর মাধ্যমে আরও জোরালো হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে তেলের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা। ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান-সমর্থিত হুথিদের কার্যক্রম এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগরের সংযোগকারী এই প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে এই রুটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এই নৌপথে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট তৈরি হলে তেলবাহী জাহাজের চলাচল ব্যাহত হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের সময় বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর সরবরাহে কোনো ধরনের বড় বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হলেই সাধারণত বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদন অঞ্চল হওয়ায় এ অঞ্চলের যেকোনো সামরিক সংঘাত বা নিরাপত্তা সংকট সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সংঘাতের সময় ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার আশঙ্কায় তেলের দাম বাড়িয়ে দেন। বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০৭ ডলারের ওপরে এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১০২ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম বেশি থাকলে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তেল উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামোর ওপর এর প্রভাব কতটা পড়ে-তার ওপরই আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকা তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে উত্তেজনা কমে এলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হয়ে দামও কমার সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়েই সীমাবদ্ধ নেই; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। তেলের দাম আবারও ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।