সারাবিশ্ব

রুশ ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা বরিস জনসনের ট্রেন


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩২ এএম

রুশ ড্রোন হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা বরিস জনসনের ট্রেন
ছবি: সংগৃহীত

ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি রেলপথে রুশ ড্রোন হামলার ঘটনায় অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও ইউরোপের কয়েকজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা। হামলার মাত্র কিছুক্ষণ আগে একই রেলপথ দিয়ে ওই এলাকা অতিক্রম করেছিলেন তারা। হামলার শিকার ট্রেনটির ইঞ্জিনে ড্রোন আঘাত হানলেও কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

ইউক্রেনের ইয়াহোদিন এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রুশ ড্রোন হামলার আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর হামলার শিকার ট্রেনটির যাত্রীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে ড্রোনটি ট্রেনটির ইঞ্জিনে আঘাত হানে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে সংস্থা উকরজালিজনিৎসিয়া জানিয়েছে, রুশ বাহিনী জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালায়।

ঘটনার সময় বরিস জনসন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলন শেষে ইউরোপের কয়েকটি দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে রেলপথে পোল্যান্ডের দিকে ফিরছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোনাথন পাওয়েলসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-তারা হামলার শিকার ট্রেনটিতে ছিলেন না। তাদের বহনকারী কূটনৈতিক ট্রেনটি আলাদা ছিল।

উকরজালিজনিৎসিয়া জানিয়েছে, রেল চলাচলের সময়সূচিতে পরিবর্তন এবং রুশ হামলার ধারাবাহিক হুমকির কারণে জনসন ও অন্য কর্মকর্তাদের বহনকারী কূটনৈতিক ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের আগেই স্টেশন ছেড়ে যায়। এর ফলে হামলার সময় তারা ওই এলাকার কাছাকাছি থাকলেও হামলার শিকার ট্রেনে অবস্থান করছিলেন না।

রেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোন আঘাত হানার মাত্র ১৫ মিনিট আগে হামলার শিকার ট্রেনটির যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এরপর যাত্রীদের ট্রেন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং কিছুক্ষণ পরই ড্রোনটি ট্রেনটির ইঞ্জিনে আঘাত হানে। এতে ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়।

ঘটনার সময় ইয়াহোদিন স্টেশনে থাকা আরেকটি ট্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সিআইএ পরিচালক ডেভিড পেট্রাউসও ছিলেন বলে জানিয়েছে উকরজালিজনিৎসিয়া। ফলে হামলার সময় ওই এলাকায় একাধিক উচ্চপর্যায়ের বিদেশি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

ইউক্রেন ও পোল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোনটি পোল্যান্ড সীমান্ত থেকে মাত্র প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে আঘাত হানে। এতটা কাছাকাছি হামলার ঘটনায় ইউক্রেনের পশ্চিম সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়া দাবি করেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল পশ্চিম ইউক্রেনের রেল অবকাঠামো।

তবে ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে সংস্থার দাবি, হামলাটি কেবল সাধারণ রেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হয়নি; বরং বরিস জনসন ও ইউরোপের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বহনকারী ট্রেনকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে। যদিও এ দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

কিয়েভ সম্মেলনে অংশ নেওয়া সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্টও ঘটনার সময় ট্রেনে ছিলেন। তিনি জানান, তাদের ট্রেন থামার পর যাত্রীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল। কয়েক মিনিট পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে তাদের আবার একই ট্রেনে যাত্রা অব্যাহত রাখার অনুমতি দেওয়া হয়।

কার্ল বিল্ট বলেন, তাদের ট্রেন থামার পর সবাইকে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা জানিয়ে তাদের ওই ট্রেনেই যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর তার ট্রেন নিরাপদে পোল্যান্ড সীমান্তের দোরোহুস্ক স্টেশনে পৌঁছায়।

তবে হামলার পর ঘটনাটি নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তিও তৈরি হয়েছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কার্ল বিল্ট ও বরিস জনসন একই ট্রেনে ছিলেন। তবে জনসন নিজে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নিশ্চিত করেননি। ইউক্রেনের রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, জনসন ও তার সঙ্গে থাকা কর্মকর্তারা হামলার শিকার ট্রেনে ছিলেন না।

হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বরিস জনসন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে ইউক্রেনের একটি দাঁড়িয়ে থাকা লোকোমোটিভ বা রেল ইঞ্জিন ধ্বংস করার পেছনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কী যুক্তি থাকতে পারে।

জনসন একই সঙ্গে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার নিয়মিত হামলার সমালোচনা করেন এবং দেশটির মিত্রদের দ্রুত আরও কার্যকর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে ইউক্রেনকে রুশ বিমান হামলা ও ড্রোন হামলা থেকে রক্ষায় পশ্চিমা দেশগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে।

ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরেই তার মিত্রদের কাছে আরও বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক সরবরাহের দাবি জানিয়ে আসছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে দেশটির আবেদন-রুশ বাহিনীর নিয়মিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় দ্রুত আরও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হোক। সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলায় দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহারও বাড়িয়েছে রাশিয়া।

ঘটনাটিকে ‘বর্বর’ আখ্যা দিয়েছেন ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা। তার অভিযোগ, এই হামলার মধ্য দিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘সন্ত্রাস’ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সীমান্তের আরও কাছে চলে এসেছে। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন।

হামলার পর পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জরুরি বৈঠক ডেকেছেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। তিনি বলেছেন, রুশ বাহিনীর উসকানি এখন বাস্তব হুমকিতে পরিণত হচ্ছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড পোল্যান্ডের সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি চলে এসেছে। সীমান্তের এত কাছে রুশ হামলার ঘটনা ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটির আকাশপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে যুদ্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিদেশি কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইউক্রেনের বিশাল রেল নেটওয়ার্ক।

যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই ইউক্রেনের রেল অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। রাশিয়াও বিভিন্ন সময়ে দেশটির ট্রেন, রেলস্টেশন, রেল ডিপো এবং সীমান্ত পারাপারের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব হামলা আরও জোরদার হওয়ায় ইউক্রেনের রেল যোগাযোগ ও সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সব মিলিয়ে, ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের এত কাছে এই ড্রোন হামলা শুধু একটি রেল ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা নয়; বরং যুদ্ধের উত্তেজনা ইউরোপের ন্যাটো সীমান্তের আরও কাছে পৌঁছে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে হামলার সময় একই এলাকায় ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ঘটনাটিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।