অর্থনীতি
২৫২ টাকার ইলিশ ১,৮০০ টাকায়! বিদেশি মাছ ‘পদ্মার ইলিশ’ পরিচয়ে বিক্রির অভিযোগ
বাংলাদেশের বাজারে ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা ইলিশের সরবরাহ বাড়ছে। তুলনামূলক কম দামে এসব বিদেশি ইলিশ বাজারে পাওয়া গেলেও অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশকে ‘পদ্মার ইলিশ’ কিংবা দেশি ইলিশের পরিচয়ে ক্রেতাদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রকৃত দেশি ইলিশের ব্যবসায়ীরাও বাজারে প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।
আমদানিকারকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানি করা এক কেজি ইলিশের মূল দাম পড়ছে প্রায় ২৫২ টাকা। এর সঙ্গে সরকারি শুল্ক প্রায় ১৬২ টাকা এবং ট্রাক ভাড়া, এলসি খরচসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় কেজিপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা যোগ হলে আমদানিকারকের মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫১৪ টাকা। তবে সেই ইলিশই দেশের খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে।
অন্যদিকে একই আকারের দেশি ইলিশের দাম বাজারে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে। ফলে তুলনামূলক কম দামের কারণে অনেক ক্রেতাই আমদানি করা ইলিশ কিনতে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখনই, যখন এসব বিদেশি মাছকে দেশি ইলিশ হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
কাস্টমস ও ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে মোট ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই মাসে এসেছে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্ট মাসে এসেছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ইলিশ। অর্থাৎ প্রথম মাসের তুলনায় দ্বিতীয় মাসে ইলিশ আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই দুই মাসে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে জুলাই মাসে আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা। আগস্ট মাসে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪ টাকা।
ফেমাস ট্রেডার্স, সততা ফিশ ফিড, শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, স্বর্ণালী ইন্টারন্যাশনাল ও রাব্বি এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে এসব ইলিশ আমদানি করেছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম জানান, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। আমদানি করা মাছ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রয়োজনীয় কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
আমদানিকারকদের হিসাবে, এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে আনা প্রতি কেজি ইলিশের দাম পড়ে প্রায় ২৫২ টাকা। এর সঙ্গে সরকারি শুল্ক, পরিবহন, এলসি ও অন্যান্য খরচ যোগ করার পর আমদানিকারকের ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৫১৪ টাকা। কিন্তু বাজারে পৌঁছানোর পর একই মাছের দাম কয়েক গুণ বেড়ে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ফলে আমদানি মূল্য ও খুচরা বাজারদরের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বাজারেও গুজরাট, মুম্বাই এবং মিয়ানমার থেকে ইলিশ যাচ্ছে। এসব মাছের কিছু অংশ বাংলাদেশের বিখ্যাত ইলিশের পরিচয়ে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দেখতে অনেকটা একই রকম হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে দেশি ও বিদেশি ইলিশের পার্থক্য বোঝা বেশ কঠিন। বাজারে মাছ কেনার সময় বাহ্যিক চেহারা দেখে অনেকেই সেটিকে দেশি ইলিশ মনে করেন। কিন্তু বাড়িতে নিয়ে রান্না করার পর স্বাদ, গন্ধ ও মাংসের বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য অনেকের কাছে ধরা পড়ে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বিদেশি ইলিশ কম দামে আমদানি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বাড়ছে এবং এতে ক্রেতারা তুলনামূলক কম দামে ইলিশ কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে বিদেশি মাছকে দেশি ইলিশের পরিচয়ে বিক্রি করা হলে তা শুধু ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণাই নয়, দেশি ইলিশের ব্যবসার জন্যও ক্ষতিকর। তাই আমদানি করা ইলিশ এবং দেশি ইলিশের পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বিক্রির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানির ফলে দেশের বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়লেও আমদানি পর্যায়ের দাম এবং খুচরা বাজারে বিক্রয়মূল্যের এত বড় ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মাত্র কয়েকশ টাকা ব্যয়ে আমদানি করা মাছ কীভাবে বাজারে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, সেটি নিয়েও ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশ দেশের বাজারে সরবরাহ বাড়ালেও বিদেশি ইলিশের পরিচয় গোপন করে দেশি ইলিশ হিসেবে বিক্রির অভিযোগ নতুন করে ভোক্তা অধিকার ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি করা মাছের উৎস ও পরিচয় স্পষ্টভাবে জানানো হলে ক্রেতারা নিজের পছন্দ ও সামর্থ্য অনুযায়ী ইলিশ কিনতে পারবেন এবং প্রতারণার সুযোগও কমবে।