অর্থনীতি

সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২০ পিএম

সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, চাপে নিম্ন আয়ের মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর বাজারে গত কয়েক দিনে বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে কাঁচামরিচের দাম একদিনেই কেজিতে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় উঠেছে।

এর পাশাপাশি আগে থেকেই বাড়তি দামে বিক্রি হওয়া ডিম, ব্রয়লার মুরগি, ডাল, আটা, ময়দা ও চিনির দামও ঊর্ধ্বমুখী। পাইকারি বাজারে কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ায় আগামী দিনে খুচরা বাজারে আরও কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।

তবে এর মধ্যে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে আলু ও পেঁয়াজের দামে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে দীর্ঘদিন ধরেই চাপে রয়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণাকে ঘিরে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী সুযোগ নিয়ে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজারে মোটর ওয়ার্কশপের কর্মী মিজানুর রহমান বলেন, দুই দিন আগেও যে কাঁচামরিচ ২০ টাকায় এক পোয়া পাওয়া গেছে, গতকাল সেটিই কিনতে হয়েছে ৪০ টাকায়। তার অভিযোগ, সাধারণ মানুষের আয় না বাড়লেও বাজারে প্রতিনিয়ত পণ্যের দাম বাড়ছে।

একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবী কামাল হোসেন। তার মাসিক আয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, পরিবারের খরচ সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ায় সংসারের ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

বেগুনবাড়ীর বাসিন্দা মারিয়া বেগম বলেন, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেশি হওয়ায় তিনি খোলা তেল কেনেন। কিন্তু তেল ও আটার দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সবজির বাজারেও অস্বস্তি

রাজধানীর আগারগাঁও, মহাখালী ও কারওয়ান বাজারে গত মঙ্গলবার পটোল, ধুন্দল ও ঝিঙা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও গতকাল এসব সবজির দাম বেড়ে ৬০ থেকে ৭০ টাকা হয়েছে।

একই সময়ে লম্বা বেগুনের দাম বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং ঢ্যাঁড়শের দাম বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা হয়েছে। অন্যান্য সবজির দামও কেজিতে কয়েক টাকা করে বেড়েছে।

গত বুধবার কাঁচামরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও গতকাল তা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ফলে এক দিনের ব্যবধানেই ক্রেতাদের কেজিতে সর্বোচ্চ ৬০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।

কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি দরে সবজি কিনে আগারগাঁওয়ে বিক্রি করা আবদুর রহিম বলেন, এক দিনের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম পাঁচ কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

তেলের সরবরাহ বাড়লেও দাম নিয়ে অস্বস্তি

বাজারে কিছুদিন ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে ঘাটতি ছিল। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার টাকা বাড়ানোর পর সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

তবে খোলা সয়াবিন তেলের দাম সরকারিভাবে না বাড়লেও নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৮০ টাকা হলেও বাজারে ক্রেতাদের প্রায় ১৯০ টাকা দিতে হচ্ছে। একইভাবে পাম তেল ১৬৩ টাকার পরিবর্তে প্রায় ১৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

আটা, ময়দা ও চিনির দামও বেড়েছে

গত এক থেকে দেড় মাসে আটার দাম কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে খোলা আটা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ময়দার দামও কেজিতে সর্বোচ্চ ১০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে খোলা ময়দা ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৭০ থেকে ৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে ছোলা, ছোলার বুট ও মসুর ডালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসে খোলা আটার দাম ৩ শতাংশ এবং খোলা ময়দার দাম ১৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে চিনির দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ।

কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, প্যাকেটজাত চিনির সরবরাহ কমে যাওয়ায় খোলা চিনির চাহিদা বেড়েছে। ফলে প্যাকেটজাত চিনি ১১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও খোলা চিনির দাম ১১৫ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

ডিম ও মুরগির দামও ঊর্ধ্বমুখী

গত দেড় মাস ধরে ডিম ও ব্রয়লার মুরগির বাজারেও দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং ডিমের এক ডজন ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন নিত্যপণ্যের আমদানি ও বাজারমূল্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা বলেন, বাজারে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম চলছে। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৭৮ লাখ পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য দেওয়া হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনেও নিয়মিত খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি ঠেকাতে ব্যবসায়ীদের ঋণপত্র খোলা, পণ্য আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।