সারাদেশ
চুল কাটতে বেরিয়ে ৭ মাস পর এক পা ও কিডনি হারিয়ে ফিরল রায়হান
মাত্র ১০০ টাকা নিয়ে চুল কাটতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ রায়হান। সাত মাস পর বাড়ি ফিরেছে সে, তবে আগের সেই চঞ্চল শিশুটি আর নেই। ডান পা হারিয়ে এবং পেট ও পিঠে অস্ত্রোপচারের গভীর ক্ষত নিয়ে বাড়ি ফিরেছে রায়হান। পরিবারের অভিযোগ, একটি অপরাধী চক্র তাকে পঙ্গু করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামিয়েছে। একই সঙ্গে তার শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছে বলেও সন্দেহ করছে পরিবার।
রায়হান চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দীনের ছেলে। সাত মাস আগে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঐতিহ্যবাহী চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় তাকে এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করতে দেখা যায়। স্থানীয়রা তাকে চিনতে পেরে পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। পরে বাবা গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।
রায়হান জানায়, চুল কাটার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে সে কক্সবাজার চলে যায়। সেখানে কয়েকজন ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে তাদের সঙ্গে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশনে যায়। সেখান থেকে কয়েকজন লোক তাকে এমন একটি জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে চারপাশে বাগান ও মাঝখানে একটি ঘর ছিল। সেখানে তার মতো আরও অনেক ছেলে ও মেয়ে ছিল।
রায়হানের ভাষ্য, এক রাতে সেখানে ঘুমিয়ে সকালে উঠে সে দেখতে পায়, তার একটি পা নেই। বিষয়টি জানতে চাইলে তাকে বলা হয়, ট্রেনে দুর্ঘটনার কারণে তার পা কেটে গেছে। এরপর প্রতিদিন তাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে ভিক্ষা করানো হতো। ভিক্ষা করে পাওয়া টাকা একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমা রাখা হতো। সেখানে দুইজন পুরুষ ও সালমা নামের এক নারী ছিল। রায়হানের দাবি, ওই স্থানে আরও অনেকের হাত পা কাটা ছিল। পরে তাকে একটি বাসে তুলে দেওয়া হলে সে চুনতি মাহফিল এলাকায় চলে আসে।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন বলেন, তার ছেলে হেফজখানায় পড়ত। একটু দুষ্টুমি করত বলে মাঝে মাঝে তাকে পানের ক্ষেতে কাজে নিয়ে যেতেন। একদিন ১০০ টাকা দিয়ে চুল কাটতে পাঠালে রায়হান কক্সবাজার চলে যায়। পরে তাকে কমলাপুরে নিয়ে গিয়ে পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয় বলে ছেলের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন।
নাজিম উদ্দীন বলেন, মাহফিলে একজন লোক ছেলেকে দেখে ফোনে খবর দিলে তিনি দ্রুত সেখানে ছুটে যান। ছেলেকে এক পায়ে ভর দিয়ে ভিক্ষা করতে দেখে দুজনই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্যের কারণে ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করার সামর্থ্যও তার ছিল না।
রায়হানের বাবার অভিযোগ, ছেলেকে উদ্ধারের পর লোহাগাড়া থানায় গিয়ে আইনি সহায়তা চাইলে পুলিশ অভিযোগ নেয়নি। তাকে কমলাপুরের সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। নাজিম উদ্দীন বলেন, তিনি দিন এনে দিন খান। ঢাকায় গিয়ে অভিযোগ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তার নেই।
রায়হানের সৎমা ফয়জুন্নেসা বলেন, চুল কাটতে গিয়ে সাত মাস পর ছেলেকে ফিরে পেলেও তার একটি পা নেই। পেটেও রয়েছে বড় অস্ত্রোপচারের দাগ। তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
মাহফিলে রায়হানকে প্রথম দেখতে পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা নুরুন্নবী বলেন, রাত ১২টার পর মাহফিলের ভিড়ের মধ্যে এক পায়ে ভর দিয়ে একটি শিশুকে ভিক্ষা করতে দেখেন তিনি। কাছে গিয়ে নাম জানতে চাইলে শিশুটি কাঁদতে কাঁদতে নিজের পরিচয় দেয়। পরে তিনি বুঝতে পারেন, এটি সাত মাস আগে নিখোঁজ হওয়া রায়হান। সঙ্গে সঙ্গে তার বাবাকে ফোন করে খবর দেওয়া হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. তৈয়ুবুল্লাহ বলেন, রায়হানের পরিবার অত্যন্ত সাধারণ ও অসহায়। ১২ বছরের শিশুর সঙ্গে যে বর্বরতা করা হয়েছে, তা কল্পনাতীত। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মানবাধিকার কর্মী দেলোয়ার হোসেন রশিদী বলেন, শিশুটির অবস্থা দেখে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত। রায়হানের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি চক্র তার জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তবে থানায় অভিযোগ না নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ। লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত প্রশান্ত কুমার ভৌমিক জানান, রায়হান সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেও তার পরিবার থানায় কোনো অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করেনি।
পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত প্রশান্ত কুমার ভৌমিক বলেন, পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রায়হান প্রায় এক মাস কক্সবাজারে ছিল। পরে তাকে কমলাপুরে নেওয়া হয়েছিল বলে তারা জানিয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রায়হান নিখোঁজ থাকার সময় কমলাপুর রেলস্টেশনে এক কনটেন্ট নির্মাতা তার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। ওই ভিডিওতে রায়হানকে বলতে দেখা যায়, জায়গা সংক্রান্ত মামলায় তার বাবা কারাগারে এবং সৎমায়ের মারধরের কারণে সে ট্রেনের ছাদে চড়ে ঢাকায় এসেছে। তবে স্বজনদের দাবি, ভয় দেখিয়ে অথবা কারও শেখানো কথায় শিশুটি এমন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারে।
মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু নিখোঁজ হচ্ছে। তাদের একটি অংশকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়ার পর বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করা জরুরি। শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনও নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ শিশুদের বড় একটি অংশের বয়স ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, নিখোঁজ প্রতিটি শিশুর ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। শিশু পাচার, অঙ্গ পাচার ও ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহারের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের জন্য সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি এবং জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা দেশব্যাপী কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।