ক্যাম্পাস
ডিগ্রি থেকে দক্ষতা: কুবিতে শিল্প-একাডেমিয়া মেলবন্ধনে নতুন দিগন্ত
পড়াশোনা শেষ, হাতে সাদা খামে জড়ানো সনাতন সার্টিফিকেট। কিন্তু চাকুরির বাজারে গিয়ে তরুণদের সামনে ঝুলছে এক কঠিন বাস্তবতা "অভিজ্ঞতা বা প্রাসঙ্গিক দক্ষতার অভাব"। শ্রেণিকক্ষে শিখে আসা তত্ত্ব আর শিল্প-কারখানার আধুনিক প্রযুক্তির বাস্তব চাহিদার এই বিশাল দূরত্ব যেন দেশের হাজারও গ্র্যাজুয়েটের চির চেনা হতাশার প্রাত্যহিক গল্প।
২০২৪ সালে প্রকাশিত লেবার ফোর্স সার্ভের প্রতিবেদন বলছে, দেশে স্নাতক পাস করা বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৭৫ হাজার। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা সনদধারী বেকারের হার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যেখানে কোনো পড়াশোনাই করেনি এমন মানুষদের বেকারত্বের হার মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, যত বেশি পড়াশোনা তত বেশি বেকারত্ব। দেশের তরুণ সমাজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘ সময় পড়াশোনায় অতিবাহিত করে থমকে আছে অনিশ্চয়তার চক্রে। এটি জানান দেয়, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সনদ তৈরিতে প্রাধান্য দেয়, দক্ষতাকে নয়।
এই দৃশ্যপট বদলাতে ও সময়োপযোগী গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) শুরু হয়েছে তোড়জোড়। শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের তাত্ত্বিক শিক্ষাকে সরাসরি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল এই বিশ্ববিদ্যালয়।
গত ১৮ আগস্ট নির্মাণাধীন নতুন ক্যাম্পাসের উপাচার্যের বাসভবনে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয় ‘রাউন্ডটেবিল অন ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া কোলাবোরেশন ইনিশিয়েটিভস’ শীর্ষক এক বিশেষ গোলটেবিল বৈঠক।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ৪২টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং শিক্ষাবিদদের উপস্থিতিতে এই আয়োজন কেবল আলোচনার টেবিলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের গতিপথ বদলে দেওয়ার এক বাস্তব ভিত্তি তৈরি করেছে।
বইয়ের পাতা থেকে সরাসরি ল্যাব ও কারখানা:
একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় অভাব হলো কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা। বৈঠকে উপস্থিত শিল্পনেতারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের এই যুগে ইন্ডাস্ট্রি ৫.০-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে পাঠ্যক্রমের আমূল সংস্কার প্রয়োজন।
এ লক্ষ্যেই অনুষ্ঠান শেষে কুবি প্রশাসনের সাথে দেশের ৬টি স্বনামধন্য শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: স্মার্ট সলিউশন, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), ড্যাপকো ভেঞ্চারস লিমিটেড, সুপ্রিম ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, উইডেভস অ্যান্ড উইল্যাব এবন ফ্লোরিনা কসমেটিকস।
চুক্তির ফলে শিক্ষার্থীরা যেসব সুবিধা পাবেন:
এর ফলে কুবির শিক্ষার্থীরা কেবল বইয়ের পাতায় মেধা সীমাবদ্ধ রাখবেন না। তারা পাবেন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি ইন্টার্নশিপ, স্পনসরশিপ এবং কর্মসংস্থানের অগ্রাধিকার। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার শিল্প খাতের কাজে ব্যবহার হবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উন্নত ল্যাব সুবিধা পাবে শিক্ষার্থীরা যা দেশের উচ্চশিক্ষায় এক ব্যতিক্রমী সংযোজন।
কবে থেকে শিক্ষার্থী এর সুবিধা পাবেন:
প্রশাসন জানায়, ইতোমধ্যেই একটি প্রতিষ্ঠানের সমঝোতা পরবর্তী আলোচনা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে তাদের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করে সবকিছু চূড়ান্ত করবে। বাকি প্রতিষ্ঠানের সাথে এইভাবে ধাপে ধাপে আলোচনার মাধ্যমে এর সুবিধা নেওয়া হবে বলে।
আইকিউএসির পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান বলেন, 'বিসিকের সাথে কথা হয়েছে আজকে (০১ সেপ্টেম্বর)। এর ফল আগামী সপ্তাহ থেকেই আমরা পাব আশা করছি। বাকিদের সাথে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করে এর ফল ভোগ করতে পারব।'
উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম এই উদ্যোগ নিয়ে নিজের স্পষ্ট দর্শনের কথা জানান। তার মতে, শিক্ষার্থীদের শুধু ডিগ্রি দেওয়াই শেষ কথা নয়, তাদের বিশ্ববাজারের যোগ্য করে গড়ে তোলাই আসল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, "এই সমঝোতার মূল লক্ষ্য আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ ও চাকরির দরজা খুলে দেওয়া। শিক্ষক-গবেষক বিনিময় এবং ল্যাব সুবিধার পারস্পরিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যা শিক্ষার্থীদের আত্মকর্মসংস্থান ও কর্মযোগ্যতাকে দ্বিগুণ করবে।"
সম্ভাবনার নতুন দিন:
ক্যাম্পাসের সবুজ চত্বরে এখন আলোচনায় নতুন আমেজ। তাত্ত্বিক পড়াশোনার পাশাপাশি হাতে-কলমে কাজ শেখার এমন সুযোগ শিক্ষার্থীদের মাঝে এক নতুন উদ্দীপনা সঞ্চার করেছে। শ্রেণিকক্ষ আর শিল্প-কারখানার মধ্যবর্তী দেওয়াল ভেঙে যে যৌথ পথচলা শুরু হলো, তা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণামুখী ও কর্মসংস্থানবান্ধব এক আধুনিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করবে- এমনটাই এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা।