সারাবিশ্ব

ইসরায়েলি বসতির পণ্যে নিষেধাজ্ঞা, বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ডসেও কড়াকড়ি


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম

ইসরায়েলি বসতির পণ্যে নিষেধাজ্ঞা, বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ডসেও কড়াকড়ি
ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা বসতিগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে ইউরোপে একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এবার সেই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডস। বসতিগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্য নিজেদের বাজারে প্রবেশ ঠেকাতে দুই দেশই পৃথক ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডসের নতুন নিষেধাজ্ঞা ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের নতুন বিধানের আওতায় অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত ইসরায়েলি বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য আমদানি, কেনাবেচা এবং এসব পণ্যের বাণিজ্য সহজ করে এমন মধ্যস্থতাকারী সেবা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর চেষ্টাও নিষিদ্ধ। ডাচ কাস্টমস জানিয়েছে, বসতিতে উৎপাদিত পণ্য নেদারল্যান্ডসের বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা যাবে না। তবে অন্য কোনো ইইউ দেশে পাঠানোর জন্য নির্দিষ্ট কাস্টমস ট্রানজিট ব্যবস্থায় পণ্য পরিবহন বা কাস্টমস গুদামে সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

এ নিষেধাজ্ঞা শুধু বাণিজ্যিক আমদানির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। নেদারল্যান্ডসে ভ্রমণকারীর ব্যক্তিগত লাগেজে থাকা বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। এমনকি কোনো পণ্য উপহার বা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হলেও তা নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। অনলাইনে অর্ডার করে নেদারল্যান্ডসে পাঠানো পণ্যও এর বাইরে নয়।

অন্যদিকে বেলজিয়ামও ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে নতুন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়ার পথে এগিয়েছে। জুলাইয়ে দেশটির মন্ত্রিসভা অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত ইসরায়েলি বসতি থেকে আসা পণ্যের জন্য বিশেষ আমদানি-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুমোদন করে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া এসব পণ্য আমদানির সুযোগ থাকবে না এবং নথিপত্র থেকে পণ্য কোনো বসতি থেকে এসেছে বলে প্রমাণিত হলে বা এমনটি যুক্তিসংগতভাবে সন্দেহ হলে আমদানির অনুমতি প্রত্যাখ্যান করার বিধান রাখা হয়েছে।

বেলজিয়ামের ব্যবস্থায় একটি ১২০ দিনের অন্তর্বর্তী সময় রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত পোস্টকোড তালিকার ভিত্তিতে কোন এলাকা ইসরায়েলি বসতির আওতায় পড়ে, তা শনাক্ত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে ফিলিস্তিনি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউরোপে বাড়ছে বসতি-বিরোধী বাণিজ্যিক পদক্ষেপ

বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের পদক্ষেপ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইসরায়েলি বসতি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। ইইউ পর্যায়ে বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যের ওপর আরও কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও কয়েকটি দেশ জাতীয় পর্যায়ে পৃথক পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান ব্যবস্থায় ইসরায়েলের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা এবং ১৯৬৭ সালের পর দখল করা ভূখণ্ডে অবস্থিত বসতিগুলোর মধ্যে পার্থক্য করা হয়। বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্য ইইউতে সাধারণভাবে আমদানি করা গেলেও সেগুলো ইসরায়েলের ভেতরের পণ্যের মতো শুল্ক-সুবিধা পায় না এবং পণ্যের উৎপত্তিস্থল যথাযথভাবে উল্লেখ করার নিয়ম রয়েছে। এখন কয়েকটি দেশ এর চেয়েও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

নেদারল্যান্ডসের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থা ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির সামগ্রিক বাণিজ্য সম্পর্ক বন্ধ করছে না। ১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমারেখার মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য এর আওতায় পড়ছে না। মূল লক্ষ্য হলো অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত নির্দিষ্ট ইসরায়েলি বসতি থেকে আসা পণ্য।

কেন বসতির পণ্য নিয়ে এত বিতর্ক?

১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের কিছু অংশ ইসরায়েলের দখলে আসে। এরপর এসব এলাকায় ইসরায়েলি বসতি গড়ে ওঠে এবং সময়ের সঙ্গে বসতিগুলোর বিস্তার ঘটে। বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিরোধ রয়েছে।

জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলি বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একটি পরামর্শমূলক মতামতেও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতি ও বসতি-সংক্রান্ত বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে গুরুতর আপত্তি তুলে ধরা হয়। ইসরায়েল অবশ্য বসতিগুলোর বৈধতা ও ভূখণ্ডের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে।

ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের যুক্তি হলো, অধিকৃত ভূখণ্ডের বসতিগুলো থেকে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য অব্যাহত থাকলে এসব বসতির অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরোক্ষভাবে শক্তিশালী হতে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েল বসতি ও সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ড নিয়ে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত অধিকার থাকার দাবি করে আসছে।

ইইউজুড়ে কি আরও কঠোর পদক্ষেপ আসছে?

ইসরায়েলি বসতির পণ্য নিয়ে ইইউ পর্যায়ে একটি অভিন্ন নীতি গ্রহণের আলোচনা চললেও ২৭ সদস্যদেশের মধ্যে এ বিষয়ে এখনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি। জুলাইয়ে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বসতি থেকে আমদানি সীমিত করার বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেন। এর মধ্যে আমদানি লাইসেন্স ব্যবস্থা, অতিরিক্ত শুল্ক এবং সরাসরি নিষেধাজ্ঞার মতো প্রস্তাবও ছিল। তবে সদস্যদেশগুলোর অবস্থান ভিন্ন হওয়ায় ইইউজুড়ে একটি অভিন্ন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অগ্রগতি সীমিত রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জাতীয় পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া দেশগুলোর সংখ্যা বাড়ছে। বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের পাশাপাশি স্পেন ও আয়ারল্যান্ডও ইসরায়েলি বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যের বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ইউরোপে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে আলাদা আলাদা দেশের পদক্ষেপ এখন বড় কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং বসতি-সংশ্লিষ্ট সহিংসতা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক চাপ বাড়ার মধ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ফলে বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের সিদ্ধান্ত শুধু বাণিজ্যিক পদক্ষেপ হিসেবে নয়, ইসরায়েলি বসতি নীতি নিয়ে ইউরোপের কিছু দেশের ক্রমবর্ধমান কঠোর অবস্থানের অংশ হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে। তবে এসব পদক্ষেপের বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা হবে এবং ইউরোপের আরও কতটি দেশ একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।