সারাবিশ্ব

যুক্তরাজ্যকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলে কটাক্ষ নেতানিয়াহুর


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম

যুক্তরাজ্যকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলে কটাক্ষ নেতানিয়াহুর
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যকে ব্যঙ্গ করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরাইল নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যকে দুই দেশের ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) প্রচারিত ইসরাইলি পডকাস্ট ‘মেলেখ ব্লিটজার হাইম’-এ এসব মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু।

ব্রিটিশ লেখক র‍্যান্ডলফ চার্চিলের উদাহরণ টেনে নেতানিয়াহু বলেন, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের সময় ইসরাইলের পক্ষে তার ইতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের প্রশংসা করা হতো। তবে বর্তমানে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে ইসরাইলের পক্ষে এমন সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় ব্যঙ্গ করে যুক্তরাজ্যকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী।

পডকাস্টে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ২০২২ সালের একটি মন্তব্যেরও প্রসঙ্গ তোলেন। সে সময় ভ্যান্স সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্রধারী একটি ইসলামপন্থী দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন বলে দাবি করেন নেতানিয়াহু।

নেতানিয়াহু বলেন, কেউ একসময় বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রথম ইসলামি প্রজাতন্ত্র হবে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’। এরপর তিনি ইরানকে ইঙ্গিত করে বলেন, সেখানে এমন আরেকটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র তৈরি হতে দেওয়া হবে না।

নেতানিয়াহুর মন্তব্যের সমালোচনা

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে ব্রিটিশ ও আইরিশ ইহুদি সংগঠন ‘মুভমেন্ট ফর প্রগ্রেসিভ জুডাইজম’। সংগঠনটির সহপ্রধান রাবাই চার্লি বাগিনস্কি ও রাবাই জশ লেভ বলেন, যুক্তরাজ্যে ইহুদিবিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ ও সামাজিক বিভাজন মানুষের মধ্যে যখন বাস্তব ভয় তৈরি করছে, তখন এ ধরনের বক্তব্য বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন।

তারা আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ব্রিটিশ ইহুদিদের হয়ে কথা বলেন না এবং তার বক্তব্য তাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের সাবেক ডাউনিং স্ট্রিটের প্রধান কর্মকর্তা গ্যাভিন বারওয়েলও নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তিনি মন্তব্যটিকে সরাসরি ইসলামবিদ্বেষ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

দুই দেশের সম্পর্কে বাড়ছে দূরত্ব

ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইল ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে।

সাবেক লেবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সময়ে যুক্তরাজ্য ইসরাইলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করে এবং কয়েকটি অস্ত্র রপ্তানির অনুমতিও স্থগিত করে।

ফ্রান্সের মতো যুক্তরাজ্যও ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রিসভার সদস্য ইতামার বেন গভির ও বেজালেল স্মোটরিচের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। গত বছর যুক্তরাজ্য ফ্রান্স ও কানাডাসহ কয়েকটি মিত্র দেশের সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড নিয়ে লেবার পার্টির প্রাথমিক অবস্থানের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি স্বীকার করেন, যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে দলটি অনেক দেরি করেছে।

বার্নহ্যাম আরও বলেন, গাজায় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি অবৈধ ইসরাইলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সম্পর্কের ‘নতুন নিম্নস্তর’

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক রোদওয়ান আবুহারব মনে করেন, নেতানিয়াহুর বক্তব্য যুক্তরাজ্য-ইসরাইল সম্পর্কের ‘নতুন নিম্নস্তর’ নির্দেশ করছে।

তবে তার মতে, ইরান ইস্যুতে দুই দেশের নীতিগত অবস্থানের মধ্যে এখনও উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।

আবুহারব বলেন, নেতানিয়াহু সম্ভবত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এমন বক্তব্য দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি তার দুর্বল ও বিভক্ত জোট সরকারকে আরও ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারেন।

গাজা যুদ্ধ, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, ইসরাইলি বসতি এবং অস্ত্র রপ্তানিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাজ্য ও ইসরাইলের মতপার্থক্য ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মন্তব্য দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

সূত্র: আল জাজিরা