সারাবিশ্ব

কানাডার সঙ্গেই থাকতে চান ৭০% আলবার্টান, বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়ার পক্ষে ২০%


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৩ পিএম

কানাডার সঙ্গেই থাকতে চান ৭০% আলবার্টান, বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়ার পক্ষে ২০%
ছবি: সংগৃহীত

কানাডার তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টায় বিচ্ছিন্নতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যতই তীব্র হচ্ছে, জনমত এখনো কানাডার সঙ্গেই থাকার পক্ষে রয়েছে। আগামী ১৯ অক্টোবরের গণভোটকে সামনে রেখে ইপসসের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ আলবার্টান প্রদেশটিকে কানাডার অংশ হিসেবেই রাখতে চান। বিপরীতে ২০ শতাংশ উত্তরদাতা ভবিষ্যতে আলবার্টার স্বাধীনতা নিয়ে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছেন।

ইপসসের এই জরিপটি ‘গ্লোবাল নিউজ’-এর জন্য ১৮ থেকে ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অনলাইনে পরিচালিত হয়। এতে মোট ১ হাজার ৫০০ কানাডিয়ান প্রাপ্তবয়স্কের মতামত নেওয়া হয়, যার মধ্যে ৬০০ জন ছিলেন আলবার্টার বাসিন্দা। জরিপে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়, ১৯ অক্টোবরের ভোট হলে তারা আলবার্টাকে কানাডার একটি প্রদেশ হিসেবে রাখার পক্ষে থাকবেন, নাকি ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে ভোট দেবেন।

তবে ১৯ অক্টোবরের ভোটকে সরাসরি ‘স্বাধীনতার গণভোট’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্যালটে থাকা দুটি বিকল্পের প্রথমটি হলো-আলবার্টা কানাডার একটি প্রদেশ হিসেবেই থাকবে। দ্বিতীয় বিকল্পে বলা হয়েছে, আলবার্টা সরকার কানাডার সংবিধান অনুযায়ী ভবিষ্যতে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা নিয়ে একটি বাধ্যতামূলক প্রাদেশিক গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে। অর্থাৎ, দ্বিতীয় বিকল্পে জয় এলেও সেদিন আলবার্টা কানাডা থেকে আলাদা হয়ে যাবে না; বরং ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আরেকটি বাধ্যতামূলক গণভোটের পথ খুলবে।

ইপসসের জরিপে দেখা যায়, কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে থাকা ভোটারদের সংখ্যা বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে থাকা ভোটারদের তুলনায় অনেক বেশি। ৭০ শতাংশের বিপরীতে দ্বিতীয় বিকল্পে সমর্থন রয়েছে ২০ শতাংশের। জরিপে আরও দেখা গেছে, বিচ্ছিন্নতার পক্ষে অবস্থান তুলনামূলকভাবে বেশি পুরুষ, তরুণ এবং ক্যালগারি ও এডমন্টনের বাইরে বসবাসকারী আলবার্টানদের মধ্যে। অন্যদিকে বড় শহরগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে কানাডার সঙ্গে থাকার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি।

তবে জনমতের পাশাপাশি ভোটার উপস্থিতিও ১৯ অক্টোবরের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, কোনো একটি পক্ষের সমর্থকেরা অন্য পক্ষের তুলনায় বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে গেলে মোট ভোটের ব্যবধানে তার প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে থাকা ভোটারদের ভোটদানের আগ্রহ এবং কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে থাকা ভোটারদের উপস্থিতি-দুটিই ফলাফলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আলবার্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকটি সাম্প্রতিক জরিপেও প্রায় একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। অ্যাবাকাস ডাটার জরিপে ৬৪ শতাংশ আলবার্টান কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন, আর ২৪ শতাংশ ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ছিলেন। জরিপে ১ হাজার আলবার্টান প্রাপ্তবয়স্কের মতামত নেওয়া হয় এবং প্রশ্নটি ১৯ অক্টোবরের ব্যালটে ব্যবহৃত ভাষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়।

অ্যাবাকাস ডাটার জরিপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-১৯ অক্টোবরের দ্বিতীয় বিকল্পে ভোট দেওয়া মানেই যে ওই ব্যক্তি আলবার্টার স্বাধীনতার পক্ষে, এমনটা নয়। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দ্বিতীয় বিকল্পের সমর্থকদের একটি অংশ সরাসরি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের চেয়ে অটোয়া থেকে আরও ক্ষমতা, রাজনৈতিক ছাড় বা আলবার্টার স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ তৈরির বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাদের কেউ কেউ মনে করেন, এই ভোট ফেডারেল সরকারের কাছে একটি রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর সুযোগ।

এ কারণে ১৯ অক্টোবরের ভোটকে দুই ধাপে বিভক্ত একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রথম ধাপে ভোটাররা সিদ্ধান্ত দেবেন-বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ভবিষ্যতে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে কি না। আর সেই প্রক্রিয়া এগিয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে আলাদা একটি বাধ্যতামূলক গণভোটে আলবার্টা কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে কি না, সে বিষয়ে ভোট হওয়ার কথা।

আলবার্টার বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নটি সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যকার বিভিন্ন মতপার্থক্যের কারণে আরও গুরুত্ব পেয়েছে। জ্বালানি ও তেল-গ্যাস নীতি, পাইপলাইন, কার্বন নির্গমন নীতি, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং অটোয়ার সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলবার্টা সরকারের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনের পর এসব ইস্যুর পাশাপাশি কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও আলবার্টার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেও কানাডার ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কানাডার উন্নয়নে আলবার্টার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং ফেডারেল ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে সহযোগিতার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদিকে আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথের সরকার বারবার স্পষ্ট করেছে যে ১৯ অক্টোবরের ভোট সরাসরি কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। স্মিথের ঘোষিত প্রশ্ন অনুযায়ী, ভোটাররা মূলত ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে মত দেবেন। সরকারিভাবেও ১৯ অক্টোবরের এই ভোটকে অ-বাধ্যতামূলক হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

জনমতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-কানাডার সঙ্গে থাকার সমর্থন শুধু সাম্প্রতিক জরিপেই নয়, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ বিচ্ছিন্নতার গণভোটের ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী দেখা যাচ্ছে। ইপসসের সেপ্টেম্বরের জরিপে কাল্পনিকভাবে ভবিষ্যতে একটি বাধ্যতামূলক বিচ্ছিন্নতা গণভোট অনুষ্ঠিত হলে ৭৪ শতাংশ আলবার্টান কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ফলে ১৯ অক্টোবরের গণভোট যত ঘনিয়ে আসছে, আলবার্টার রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান জরিপগুলোতে কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমত দেখা যাচ্ছে। তবে ভোটের আগে জনমতে পরিবর্তন, ভোটার উপস্থিতি এবং বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নকে ভোটাররা কীভাবে ব্যাখ্যা করছেন-এসব বিষয় শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ১৯ অক্টোবরের ভোটে আলবার্টানরা যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, এর ফল প্রদেশটির সঙ্গে অটোয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং কানাডার ফেডারেল কাঠামো নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।