সারাবিশ্ব
দাবি পূরণ না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়, পাকিস্তানকে জানাল ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে নিজেদের শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না। দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তান মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিলেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে ইরান। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) তেহরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এ অবস্থানের কথা জানান বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনা, মধ্যস্থতার উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। ইরানের সংবাদমাধ্যম নূরনিউজও বৈঠকের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত জুনে দুই দেশের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে আবারও সংঘাত শুরু হয়। ফলে সংঘাত বন্ধে নেওয়া আগের উদ্যোগগুলো বাধার মুখে পড়ে এবং সমঝোতার প্রচেষ্টা নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার তেহরান সফর করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পাশাপাশি তিনি ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ নিরসন এবং সংঘাত বন্ধের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা হয়।
ইরানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বৈঠকের বিবরণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে গত মাসে তেহরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত সাতটি শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। ইরানের এসব শর্তের মধ্যে দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার, তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন রণাঙ্গনে সংঘাত বন্ধের বিষয় রয়েছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে পৃথক বৈঠকেও একই ধরনের অবস্থানের কথা জানান ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি। ইরানের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় বসবে না ইরান-এমন বার্তাই দেন তিনি। তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার আগে ইরানের শর্তগুলো বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে ইরান। মোহসেন রেজায়ি বলেন, সমৃদ্ধ করা সব পারমাণবিক উপাদান ইরানের ভেতরেই থাকবে। এ সময় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। খামেনির বক্তব্য অনুযায়ী, অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রার কাছাকাছি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো উচিত নয়। ফলে পারমাণবিক উপাদানের নিয়ন্ত্রণ ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়টি দুই দেশের বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে রয়েছে।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছিলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবি পূরণ করতে হলে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। আট মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তবে এ বিষয়ে দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইউরোপের কয়েকটি পশ্চিমা দেশ। তাদের অভিযোগ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে দেশটির ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানির জন্য সাধারণত প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধকরণের মাত্রার তুলনায় ৬০ শতাংশ অনেক বেশি এবং অস্ত্র তৈরির জন্য প্রচলিতভাবে উল্লেখ করা প্রায় ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণের মাত্রার কাছাকাছি।
অন্যদিকে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে তেহরান। ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বন্দর অবরোধ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মতো বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরান শর্ত পূরণের আগে আলোচনায় না বসার অবস্থান জানানোয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। দুই দেশের বিরোধ নিরসনে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের।