সারাবিশ্ব

ভারতে একের পর এক ঐতিহাসিক মসজিদ ভাঙার হিড়িক


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম

ভারতে একের পর এক ঐতিহাসিক মসজিদ ভাঙার হিড়িক
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের একটি অংশ অপসারণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে মসজিদের নির্দিষ্ট অংশ সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ এর প্রতিবাদ করেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে এবং একাধিক মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ঘটনার সূত্রপাত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে। মসজিদের সামনে অবস্থান নিয়ে স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের একটি অংশ সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য ঐতিহাসিক স্থাপনাটির অংশ অপসারণের বিরোধিতা করেন। তারা দাবি করেন, মসজিদের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে বিকল্প উপায়ে সড়ক সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাতভর অবস্থানের পর সোমবার সকালে প্রশাসন নির্ধারিত অংশ অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

পুলিশের অভিযোগ, একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে শুরু করে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করে। স্থানীয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

উজ্জয়িনী পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংঘর্ষ ও পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি সাতটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, তা শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য বা উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়ানো হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুরো শাহী মসজিদ নয়, অপসারণ করা হচ্ছে নির্দিষ্ট অংশ

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো শাহী মসজিদ ভেঙে ফেলার দাবি ছড়িয়ে পড়লেও প্রশাসন ও একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো মসজিদ অপসারণ করা হচ্ছে না। সড়ক সম্প্রসারণের জন্য প্রস্তাবিত সীমানার মধ্যে পড়া মসজিদের একটি অংশই সরানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সড়কটি প্রায় ১৫ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ৯ সেপ্টেম্বরের আদেশেও মসজিদের একটি অংশ অপসারণ করে সড়ক প্রশস্ত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় স্থাপনাটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত এবং মসজিদের একটি অংশ সড়ক প্রশস্তকরণের প্রস্তাবিত সীমানার মধ্যে পড়েছে।

২০২৮ সালের সিংহস্থকে সামনে রেখে সড়ক সম্প্রসারণ

উজ্জয়িনী ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শহর। ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভকে সামনে রেখে শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক সম্প্রসারণ ও যানবাহন চলাচলের সুবিধা বাড়ানোর কাজ চলছে। প্রশাসনের বক্তব্য, সিংহস্থের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হবে। তাই জননিরাপত্তা, যান চলাচল ও নগর ব্যবস্থাপনার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রশস্ত করা প্রয়োজন।

মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট এর আগে শাহী মসজিদের অংশ অপসারণের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি আবেদন খারিজ করে প্রশাসনের সড়ক সম্প্রসারণের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার পথ পরিষ্কার করে। আদালতের নথিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট সড়কটি উজ্জয়িনীর গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শোভাযাত্রার পথ এবং সিংহস্থের সময় বিপুল মানুষের চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা প্রয়োজন।

মসজিদ কমিটির সঙ্গে প্রশাসনের সমঝোতার দাবি

পরবর্তীতে শাহী মসজিদের সংশ্লিষ্ট কমিটি ও উজ্জয়িনী পৌর করপোরেশনের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ওই সমঝোতার বিষয়টি নথিভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট আপিলের নিষ্পত্তি করে। তবে সমঝোতার বিস্তারিত শর্ত আদালতের নথিতে প্রকাশ করা হয়নি।

অন্যদিকে, স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের একটি অংশ মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে এর অংশ অপসারণের বিরোধিতা করে আসছেন। তাদের বক্তব্য, ধর্মীয় স্থাপনাটি অক্ষত রেখে রাস্তার অন্য পাশ থেকে জমি নিয়ে সড়ক প্রশস্ত করার বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে মতবিরোধ ও উত্তেজনা তৈরি হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি

সংঘর্ষের পর ঘটনাটিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও, ছবি ও দাবি ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ জানিয়েছে, এসব কনটেন্টের মধ্যে বিভ্রান্তিকর বা উসকানিমূলক তথ্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। কিছু প্রতিবেদনে পুরো মসজিদ ভেঙে ফেলার দাবি করে তৈরি বা বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর শাহী মসজিদ ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি যাতে আরও উত্তপ্ত না হয়, সে জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমের ওপরও নজরদারি চালানো হচ্ছে।

উজ্জয়িনীর শাহী মসজিদকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি একদিকে যেমন ২০২৮ সালের সিংহস্থকে সামনে রেখে চলমান নগর উন্নয়ন ও সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের বিষয়টি সামনে এনেছে, অন্যদিকে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয় নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।